আন্তর্জাতিকএশিয়ামধ্যপ্রাচ্যযুক্তরাষ্ট্র

যেভাবে ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্রে পরিণত হয়েছে হরমুজ প্রণালি

ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে সাম্প্রতিক সংঘাত বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে—ইরানের সবচেয়ে বড় শক্তি তার পারমাণবিক সক্ষমতা নয়, বরং কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি-এর ওপর তার প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ। এই সংকীর্ণ জলপথটি পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে এবং বিশ্বের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তেল ও গ্যাস এই পথ দিয়েই আন্তর্জাতিক বাজারে পরিবাহিত হয়। ফলে এই পথের স্বাভাবিক চলাচলে বিঘ্ন ঘটলে তার প্রভাব সরাসরি বৈশ্বিক অর্থনীতি ও রাজনীতিতে পড়ে।

সংঘাতের শুরুর দিকে অনেকেই ধারণা করেছিলেন, এটি ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের একটি প্রচেষ্টা, যেখানে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও নেতাদের লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। ইরানও পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানায়। তবে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইরান তাদের কৌশল পরিবর্তন করে। সরাসরি সামরিক সংঘর্ষের পরিবর্তে তারা হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করার দিকে মনোযোগ দেয়, যা দ্রুতই যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ওপর ব্যাপক অর্থনৈতিক ও কৌশলগত চাপ সৃষ্টি করে।

এই কৌশলের ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয় এবং তেলের দাম বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া আরও জটিল হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে ইউরোপীয় মিত্রদের অনীহা এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপও পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করে। ফলে শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রকে কৌশল পুনর্বিবেচনা করতে হয় এবং যুদ্ধবিরতির আলোচনায় আগ্রহী হতে দেখা যায়।

অন্যদিকে, ইরান এই পরিস্থিতিকে কৌশলগত সাফল্য হিসেবে উপস্থাপন করছে। তারা হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করার পরিকল্পনা করছে, এমনকি এই পথ দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোর ওপর শুল্ক আরোপের প্রস্তাবও বিবেচনায় রয়েছে। তবে এই ধরনের পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইন ও নৌ চলাচলের স্বাধীনতার প্রশ্নে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ তার মিত্রদের সঙ্গে সংঘাত আবারও তীব্র হয়ে ওঠার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

তবে ইরানের এই কৌশলগত সুবিধার আড়ালে বাস্তবতা অনেকটাই জটিল। দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা ও যুদ্ধের ক্ষতির কারণে দেশটির অর্থনীতি চাপে রয়েছে এবং সামরিক ক্ষেত্রেও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তবুও এই সংঘাত দেখিয়েছে যে, আধুনিক বিশ্ব রাজনীতিতে শুধুমাত্র সামরিক শক্তি নয়, ভৌগোলিক অবস্থান ও অর্থনৈতিক প্রভাবও একটি দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শক্তিতে পরিণত হতে পারে। ইরান সেই বাস্তবতাকেই কাজে লাগিয়ে একটি বড় শক্তির বিরুদ্ধে কার্যকর চাপ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট খবর

Back to top button