বিএনপিরাজনীতি

ঐক্যফ্রন্ট ৭০ পুলিশ কর্মকর্তার প্রত্যাহার চায়

সংসদ নির্বাচনে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ‘অতি দলবাজ’ ও ‘চিহ্নিত বিতর্কিত’ ৭০ পুলিশ কর্মকর্তার প্রত্যাহার চেয়েছে ।

আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর আগারগাঁওয়ের নির্বাচন কমিশনে গিয়ে নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিব হেলালুদ্দীন আহমদের কাছে একটি চিঠি দেয় তারা। বিএনপির মহাসচিব ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মুখপাত্র মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্বাক্ষরিত চিঠিটি পৌঁছে দেন দলের যুগ্ম মহাসচিব মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নুরুল হুদা বরাবর লেখা ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে রাজনৈতিক সংলাপ ও পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন বিষয়ে মাঠ প্রশাসনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির জন্য বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে মৌখিক ও লিখিতভাবে আহ্বান জানানো হয়েছে। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলের সংলাপে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সুষ্ঠু নির্বাচন এবং একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার সময় সিইসির জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে সকল দল ও প্রার্থীর জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড প্রতিশ্রুতির কথাও ব্যক্ত করেছেন চিঠিতে।

চিঠিতে বলা হয়, তফসিল ঘোষণার ১০/১২ দিন অতিবাহিত হলেও এসব প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কোনো কার্যক্রম দৃশ্যমান নয়। বরং সরকারের সাজানো পুলিশ প্রশাসনের অতি দলবাজ ও চিহ্নিত বিতর্কিত কর্মকর্তারা নির্বাচনি মাঠ দাবড়িয়ে বেড়াচ্ছে। কিন্তু কমিশন এসব বিতর্কিত কর্মকতাদের প্রত্যাহারে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। এ অবস্থায় তালিকায় উল্লেখ ৭০ পুলিশ কর্মকর্তাকে অবিলম্বে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে ঐক্যফ্রন্ট।

চিঠিতে আরও বলা হয়, গত ১০ বছরে পুলিশের গুটিকয়েক দলবাজ কর্মকর্তা ঘুরেফিরে গুরুত্বপূর্ণ জেলার পুলিশ সুপার ও ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) সমমর্যাদার পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। একেকজন ৩ থেকে ৪ জেলায় পুলিশ সুপারের দায়িত্ব পালন করেছেন। অথচ পুলিশ বিভাগে পুলিশ সুপার পদমর্যাদার অন্তত ৭০০ জন যোগ্য কর্মকর্তা রয়েছেন,যারা দীর্ঘদিন ধরে এসব গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়নবঞ্চিত রয়েছেন।

তালিকায় থাকা ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা

ঐক্যফ্রন্ট যে ৭০ জন পুলিশ কর্মকর্তার প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে, তার মধ্যে পুলিশ সদর দফতর, ডিএমপিসহ বিভিন্ন বিভিন্ন বিভাগীয় পর্যায়ের অতিরিক্ত আইজিপি, ডিজি, ডিআইজি, কমিশনার ও ডিসি পদমর্যাদার কর্মকর্তা রয়েছেন ৩৯ জন। বাকি ৩১ জন পুলিশ সুপার পদে কর্মরত। তাদের মধ্যে ঢাকা বিভাগে ছয় জন, ময়মনসিংহ বিভাগে দুই জন, সিলেট বিভাগে একজন, বরিশাল বিভাগে দুই জন, খুলনা বিভাগে ছয় জন, চট্টগ্রাম বিভাগে চার জন, রংপুর বিভাগে তিন জন ও রাজশাহী বিভাগে কর্মরত সাত জন।

পুলিশ সদর দফতরে কর্মরতরা হলেন— পুলিশ সদর দফতরের অতিরিক্ত আইজিপি (প্রশাসন) মোখলেছুর রহমান (নিজ জেলা জামালপুর), ডিআইজি (প্রশাসন) হাবিবুর রহমান (গোপালগঞ্জ), ডিআইজি (অপারেশন) আনোয়ার হোসেন (কিশোরগঞ্জ), ডিআইজি (ট্রেনিং) ড. খ মহিদ উদ্দিন (বরিশাল) ও অতিরিক্ত ডিআইজি মো. মনিরুজ্জামান (যশোর)।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশে (ডিএমপি) কর্মরতরা হলেন— ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া (নিজ জেলা ফরিদপুর), ডিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের প্রধান অতিরিক্ত কমিশনার মো. মনিরুল ইসলাম (গেপালগঞ্জ), অতিরিক্ত কমিশনার (ডিআইজি) মীর রেজাউল আলম (মাগুরা), অতিরিক্ত কমিশনার (ডিআইজি) কৃষ্ণপদ রায় (হবিগঞ্জ), অতিরিক্ত কমিশনার (ডিআইজি) আব্দুল বাতেন (সুনামগঞ্জ), যুগ্ম কমিশনার (অতিরিক্ত ডিআইজি) শেখ নাজমুল আলম (নড়াইল), যুগ্ম কমিশনার (ডিবি) মাহবুব আলম (কুমিল্লা), ডিসি (তেজগাঁও) বিপ্লব কুমার সরকার (কিশোরগঞ্জ), ডিসি হারুন অর রশিদ (কিশোরগঞ্জ), ডিসি (রমনা) মো. মারুফ হোসেন সরদার (খুলনা), ডিসি (ডিবি, উত্তর) খন্দকার নুরুন নবী (মাগুরা), ডিসি এস এম মুরাদ আলী (গোপালগঞ্জ), এডিসি শিবলী নোমান (গোপালগঞ্জ) ও সিটিটিসি ইউনিটের ডিসি প্রলয় কুমার জেয়ার্দার (নেত্রকোনা)।

এর বাইরে র‌্যাবের মহাপরিচালক ডিজি (অতিরিক্ত আইজিপি) বেনজীর আহম্মেদ (নিজ জেলা গোপালগঞ্জ), টেলিকম ইউনিটের অ্যাডিশনাল আইজিপি মো. ইকবাল বাহার (পাবনা), নৌপুলিশের ডিআইজি শেখ মো. মারুফ হাসান (খুলনা), পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) ডিআইজি (সিটিএসবি) মোহাম্মদ আলী মিয়া (গোপালগঞ্জ), পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) এসএস (এসপি) মোল্যা নজরুল ইসলাম (নড়াইল) ও সিলেট ট্যুরিস্ট পুলিশের এসপি আলতাফ হোসেনের (পাবনা) প্রত্যাহারও চেয়েছে ঐক্যফ্রন্ট।

ঐক্যফ্রন্টের প্রত্যাহারের দাবির তালিকায় রয়েছেন পুলিশের পাঁচ রেঞ্জের ডিআইজি ও তিন রেঞ্জের অ্যাডিশনাল ডিআইজি। তারা হলেন— সিলেট রেঞ্জের ডিআইজি মো. কামরুল আহসান (নিজ জেলা চাঁদপুর), চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি খন্দকার গোলাম ফারুক (টাঙ্গাইল), খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি মো. দিদার আহম্মেদ (গোপালগঞ্জ), রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি এম খুরশীদ হোসেন (গোপালগঞ্জ) ও রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি দেবদাস ভট্টাচার্য (মৌলভীবাজার) এবং খুলনা রেঞ্জের অ্যাডিশনাল ডিআইজি এ কে এম নাহিদুল ইসলাম (নিজ জেলা ময়মনসিংহ), সিলেট রেঞ্জের অ্যাডিশনাল ডিআইজি জয়দেব কুমার ভদ্র (খুলনা) ও ঢাকা রেঞ্জের অ্যাডিশনাল ডিআইজি মো. আসাদুজ্জামান মিয়া (মাদারীপুর)।

এছাড়া খুলনা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের ছয় কর্মকর্তাও রয়েছে ঐক্যফ্রন্টের তালিকায়। তারা হলেন— খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার (ডিআইজি) হুমায়ুন কবির (নিজ জেলা ব্রাহ্মণবাড়িয়া), চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার (ডিআইজি) মাহবুবুর রহমান রিপন (জামালপুর), রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার (ডিআইজি) হাফিজ আক্তার (গাজীপুর), রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের অধিনায়ক (অতিরিক্ত ডিআইজি) চৌধুরী মঞ্জুরুল কবির (রাজবাড়ী), চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের ডিসি এস এম মেহেদী হাসান (খুলনা) ও চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের ডিসি মো, ফারুকুল হক (সিরাজগঞ্জ)।

ঐক্যফ্রন্টের তালিকায় থাকা পুলিশ সুপাররা

ঐক্যফ্রন্টের দেওয়া তালিকায় রয়েছেন ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন জেলায় পুলিশ সুপার (এসপি) হিসেবে কর্মরত ছয় ছয় কর্মকর্তা। তারা হলেন— ঢাকার এসপি শাহ মিজান শফি (নিজ জেলা নাটোর), নারায়ণগঞ্জের এসপি মো. আনিসুর রহমান (গোপালগঞ্জ), মুন্সীগঞ্জের এসপি মো. যায়েদুল আলম (মাদারীপুর), নরসিংদীর এসপি মিরাজ (পটুয়াখালী), টাঙ্গাইলের এসপি সঞ্জিত কুমার রায় (সুনামগঞ্জ) ও মাদারীপুরের এসপি সুব্রত কুমার হাওলাদার (বাগেরহাট)।

তালিকায় ময়মনসিংহ বিভাগের দুই জেলার পুলিশ সুপার হলেন— ময়মনসিংহের এসপি শাহ আবিদ হোসেন (নিজ জেলা বাগেরহাট) ও শেরপুরের এসপি আশরাফুল আজিম (ঝিনাইদহ); সিলেট বিভাগের সিলেট জেলার এসপি মো. মনিরুজ্জামান (পটুয়াখালী); বরিশাল বিভাগের বরিশাল জেলার এসপি সাইফুল ইসলাম (পাবনা) ও ভোলার এসপি মোক্তার হোসেন (পটুয়াখালী) এবং রংপুর বিভাগের রংপুর জেলার এসপি মিজানুর রহমান (জামালপুর), দিনাজপুরের এসপি সৈয়দ আবু সায়েম (ফরিদপুর) ও ঠাকুরগাঁওয়ের মনিরুজ্জামান (কুষ্টিয়া)।

বিএনপির তালিকায় খুলনা বিভাগের ছয় জেলার এসপি রয়েছেন। তারা হলেন— খুলনার এসপি এস এম শফিউল্লাহ (নিজ জেলা গোপালগঞ্জ), সাতক্ষীরার এসপি মো. সাজ্জাদুর রহমান (ঝিনাইদহ), বাগেরহাটের এসপি পংকজ চন্দ্র রায় (লালমনিরহাট), যশোরের এসপি মঈনুল হক (পটুয়াখালী), ঝিনাইদহের এসপি (হাসানুজ্জামান) ও কুষ্টিয়ার এসপি আরাফাত তানভীর (বাগেরহাট)।

তালিকার চট্টগ্রাম বিভাগের চার জেলার এসপিরা হলেন— চট্টগ্রামের এসপি নূরে আলম মিনা (নিজ জেলা গোপালগঞ্জ), নোয়াখালীর এসপি ইলিয়াস শরীফ (ফরিদপুর), ফেনীর এসপি এস এম জাহাঙ্গীর আলম সরকার (পাবনা) ও কুমিল্লার এসপি সৈয়দ নুরুল ইসলাম (চাঁপাইনবাবগঞ্জ)।

রাজশাহী বিভাগের সাত জেলার এসপিদেরও প্রত্যাহার দাবি করেছে ঐক্যফ্রন্ট। তারা হলেন— রাজশাহীর এসপি মো. শহিদুল্লাহ (নিজ জেলা শেরপুর), চাঁপাইনবাবগঞ্জের এসপি মোজাহিদুল ইসলাম (গাজীপুর), নওগাঁর এসপি ইকবাল হোসেন (পাবনা), নাটোরের এসপি সাইফুল্লাহ (নেত্রকোনা), বগুড়ার এসপি আশরাফ আলী (নেত্রকোনা), সিরাজগঞ্জের এসপি টুটুল চক্রবর্তী (লক্ষ্মীপুর) ও পাবনার এসপি রফিক ইসলাম (গোপালগঞ্জ)।

ইসিতে তালিকা জমা দিয়ে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব আলাল বলেন, নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির জন্য পুলিশের দলবাজ ও রাজনৈতিক মতাদর্শের অনুসারী কর্মকর্তাদের নির্বাচনি দায়িত্ব না দেওয়া জন্য বলেছি। পুলিশের ডিআিইজি, অতিরিক্ত ডিআইজি, পুলিশ সুপারের মতো পদধারী ৭০ জন কর্মকর্তাকে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছি। যারা সমতল মাঠকে অসমতল করার কাজে ব্যস্ত, তাদের নাম-পদবী-কর্মস্থলসহ সব তথ্য নির্বাচন কমিশনের কাছে দিয়েছি।

মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল আরও বলেন, সিইসি আজ (বুধবার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে ইসির বৈঠকে) নিরপেক্ষ থাকার জন্য পুলিশকে আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু আহ্বান জানানো মানে অনুরোধ করা। তিনি তো নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন।

বাংলাটিভি/এসএম/এবি

সংশ্লিষ্ট খবর

Back to top button
Close