দেশবাংলা

বোয়ালমারীতে গণকবরের উপর শৌচাগার

চরম অবহেলা, অযত্ন আর অবমাননায় মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের দশজন শহীদ শুয়ে আছে একটি গণকবরে! গণকবরটির উপর নির্মান করা হয়েছে শৌচাগার! ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার ঘোষপুর ইউনিয়নের গোহাইলবাড়ি বাজারে অবস্থিত গণকবরটি চরম উদাসীনতা আর অবহেলায় এখন প্রায় নিশ্চিহ্নের পথে।

রাজাকার ও পাক হানাদার বাহিনীর নির্মম হত্যাযজ্ঞের শিকার দশজন শহীদের গণকবরটি এখন ঝোপঝাড় ঘেরা শৌচাগারের ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে।

মহান স্বাধীনতার যুদ্ধের প্রথম দিকেই ফরিদপুরের বোয়ালমারীতে রাজাকার কোটন বাহিনী ও পাক হানাদারদের হাতে নির্মমভাবে শহীদ হন দশজন সাধারণ নাগরিক। উপজেলা সদর থেকে ১০ কিলোমিটার দুরে ঘোষপুর ইউনিয়নের গোহাইলবাড়ি বাজার।

এখানেই ১৯৭১সালের ২২শে মে শনিবার-হাটবারের দিন চালানো হয় নির্মম হত্যাযজ্ঞ। সেদিন সবে জমতে শুরু করেছে হাট। হাটুড়িয়াদের আনাগোনা আর দোকানীরা বসেছে পশরা মেলে, এমন সময় ততকালীন সাংসদ এম এ ওয়াহিদ টেপু মিয়ার ছেলে, আলবদর প্রধান, কুখ্যাত রাজাকার কোটন মিয়ার আহ্বানে জিপ ভরতি পাকা-হানাদার বাহিনীর একটি কনভয় প্রবেশ করে হাটটিতে।

সাধারণ মানুষ কিছু বুঝে উঠার আগেই রাজাকারদের আল্লাহু আকবর ধ্বনির সাথে গর্জে ওঠে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর সয়ংক্রিয় রাইফেল। হানাদারদের এলোপাতারি গুলিতে হাটের মধ্যেই লুটিয়ে পড়ে নারায়ন, নিতাই, তেল বিক্রেতা জহুরুল হক, হাশেম কাজী। মুহূর্তে খালি হয়ে যায় হাটটি।

তারপর হিন্দু অধ্যষিত বাজারটিতে বেছে বেছে হিন্দু বাড়িতে আক্রমন চলনো হয়। হত্যা করা হয় জীবন চন্দ্র দাশ, হরিপদ ময়লকে। বয়সের ভারে নূজ্যু, পালাতে না পাড়া ৯০বছরের বৃদ্ধা কালীতারাও নির্মম হত্যাযজ্ঞের হাত থেকে বাদ পড়ে না।

বিছানায় শয্যাশায়ী কালীতারাকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে নির্মমভাবে অত্যাচার শেষে তাঁরই বসত ঘরসহ হত্যা করা হয় আগুনে পুড়িয়ে। হত্যা করা হয় ৬০বছর বয়সী বৃদ্ধা যশোদা রানীকেও। গ্রামের সমস্ত বাড়িঘরে চালানো হয় লুটপাট আর অগ্নিসংযোগ।

হানাদার বাহিনী লুটপাট শেষে ফিরে গেলে স্থানীয়রা শহীদদের মৃত দেহগুলো কোনমতে গর্তখুরে সামাহিত করে। প্রত্যক্ষদর্শীর অভাবে অনেকটাই নিশ্চিনের পথে গণকবরটি। তাদের স্মরণে নির্মিত হয়নি কোনো স্মৃতিস্তম্ভ বরং গণকবরটির পাশ ঘেষে নির্মাণ করা হয়েছে একটি শৌচাগার। যা শহীদের জন্য অবমাননা কর।

সেদিন রাজাকারদের ক্যাম্প বানানোর লক্ষ্যে গ্রামের একটি বাড়িতে রেখে আগুনে ভস্মভুত করা হয় পুরো গ্রাম। সেদিন আগুনের লেলিহান শিখায় গ্রামের একটি বাড়িতেও ঘরের পোতা-মাটি ছাড়া একটি খুঁটিও দাঁড়িয়ে ছিল না।

মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের গোহাইলবাড়ি হত্যাযজ্ঞের শহীদের স্মৃতি সংরক্ষণে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মানের দাবি স্থানীয় এলাকাবাসীর।

বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হয়েছি অচিরেই গণ হত্যায় শাহাদৎ বরণকারীদের স্মরণে জয়গাটি চিহ্নিত করে একটি শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন, বোয়ালমারী উপজেলা নির্বাহী অফিসার ঝোটন চন্দ।

স্বাধীনতার ৪৮বছর পেরিয়ে গেলেও আজও স্বীকৃতি মেলেনি এই শহীদদের। প্রত্যক্ষদর্শীদের দিয়ে গণকবরটি চিহ্নিত করে সরকারিভাবে সম্ভব না হলেও স্থানীয়ভাবে কবরটি সংরক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ ও শহীদদের স্বীকৃতিসহ শহীদ পরিবারগুলোকে রাষ্ট্রীয় মর্যদা প্রদানের দাবি করেছে স্থানীয়রা।

খান মোস্তাফিজুর রহমান, বোয়ালমারী ও আলফাডাঙ্গা প্রতিনিধি

সংশ্লিষ্ট খবর

Back to top button
Close