ফেসবুকে হারানো বিজ্ঞপ্তি দেখে পরিবারকে ফোন, কণ্ঠ নকল করে মুক্তিপণ আদায়

বাংলা টিভি ডেস্ক: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান চেয়ে প্রকাশ করা বিজ্ঞপ্তিকে প্রতারণার হাতিয়ার বানিয়েছিল একটি চক্র। ফেসবুকে নিখোঁজ ব্যক্তির ছবি ও পরিচয় সংগ্রহ করে তাদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করত চক্রের সদস্যরা। এরপর ওই ব্যক্তিকে অপহরণের কথা জানিয়ে দাবি করা হতো মুক্তিপণ। পরিবারের সদস্যরা স্বজনের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তার কণ্ঠ নকল করে নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিনয় করা হতো। এভাবে ভয় দেখিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া চক্রের মূল হোতা ফয়সাল আহমেদ ও তার সহযোগী আল-আমিনকে গ্রেপ্তার করেছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি-৩)।
শনিবার (৭ নভেম্বর) রাতে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী ও ডেমরা এলাকায় পৃথক অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করা হয়। এ সময় প্রতারণার কাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন ডিজিটাল সরঞ্জামও উদ্ধার করা হয়েছে।
রোববার (৮ নভেম্বর) বিকেলে এসআরবি-৩-এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড মিডিয়া কর্মকর্তা মো. মেহেদী ইমরান সিদ্দিকী এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানান।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গাজীপুর মহানগরীর কালিয়াকৈর থানায় দায়ের করা একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) এবং ভুক্তভোগী পরিবারের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে চক্রটির প্রতারণার বিষয়টি তদন্তে আসে।
অভিযোগ অনুযায়ী, হৃদয় আনসারী নামে এক তরুণ গাজীপুর থেকে রাজধানীর মগবাজারে যাওয়ার পথে অপহৃত হয়েছেন বলে তার পরিবারের কাছে ফোন করা হয়। অজ্ঞাত একটি নম্বর থেকে যোগাযোগ করে জানানো হয়, হৃদয় অপহরণকারীদের হাতে জিম্মি রয়েছেন। তাকে ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে ৫০ হাজার টাকা দাবি করা হয়।
স্বজনের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে পরিবারের সদস্যরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে বিভিন্ন বিকাশ ও নগদ নম্বরে মোট ৪০ হাজার টাকা পাঠান তারা। কিন্তু টাকা দেওয়ার পরও হৃদয়ের কোনো খোঁজ না পাওয়ায় সন্দেহ তৈরি হয়। পরে তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে অভিযোগ করেন।
অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিকাশ ও নগদ নম্বরের সূত্র ধরে ছায়া তদন্ত শুরু করে এসআরবি-৩। তদন্তের ধারাবাহিকতায় গত ২৮ অক্টোবর যাত্রাবাড়ী এলাকায় অভিযান চালিয়ে বিকাশের একটি দোকান এবং মুক্তিপণের টাকা দাবিতে ব্যবহৃত নম্বরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একজনকে আটক করা হয়।
জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, যে মোবাইল নম্বর থেকে মুক্তিপণ দাবি করা হয়েছিল, সেটির মালিকের ফোন গত ৫ অক্টোবর হারিয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় প্রতারণার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়।
এরপর যাত্রাবাড়ী এলাকা থেকে চক্রের প্রধান অভিযুক্ত মো. ফয়সাল আহমেদ এবং ডেমরা থেকে তার সহযোগী মো. আল-আমিনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা জানান, দীর্ঘদিন ধরে তারা একই কৌশলে প্রতারণা চালিয়ে আসছিলেন। প্রথমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান চেয়ে দেওয়া পোস্ট ও বিজ্ঞপ্তি থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করতেন। পরে ওই ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের ফোন করে অপহরণের গল্প সাজিয়ে মুক্তিপণ দাবি করতেন। টাকা নেওয়ার জন্য ব্যবহার করা হতো বিকাশ ও নগদের বিভিন্ন নম্বর।
তদন্তে আরও জানা যায়, বাস্তবে নিখোঁজ ব্যক্তিকে অপহরণ বা কোথাও আটকে রাখা হতো না। পরিবারের সদস্যরা স্বজনের সঙ্গে কথা বলার আগ্রহ প্রকাশ করলে চক্রের সদস্য আল-আমিন ওই ব্যক্তির কণ্ঠস্বর নকল করে কথা বলতেন। পাশাপাশি তাকে মারধর ও শারীরিক নির্যাতন করা হচ্ছে—এমন পরিস্থিতির অভিনয় করে স্বজনদের আতঙ্কিত করা হতো। এভাবে মানসিক চাপ সৃষ্টি করে অর্থ আদায়ের কৌশল নিয়েছিলেন তারা।
এসআরবি-৩ জানিয়েছে, প্রতারণায় ব্যবহৃত মোবাইল ফোনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) হিসাবের লেনদেন বিশ্লেষণ করেও অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে মোবাইল ফোন হারানোর পর সিম বন্ধ করার বিষয়েও সতর্ক করা হয়েছে। এসআরবি-৩ জানায়, ফোন হারানোর পর সংশ্লিষ্ট সিম চালু থাকলে প্রতারকরা সেটি ব্যবহার করে বিকাশ, নগদসহ বিভিন্ন মোবাইল আর্থিক সেবার হিসাব খুলে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালাতে পারে। এতে প্রকৃত ফোন মালিক অপরাধের সঙ্গে জড়িত না থাকলেও ওই সিম ব্যবহার করে সংঘটিত অপরাধের ঘটনায় তাকে সন্দেহের মুখে পড়তে হতে পারে।
গ্রেপ্তার দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে এসআরবি-৩।



