‘ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ হলে পাকিস্তানের পক্ষ নেওয়া উচিত ইহুদিদের’

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ভারত ও ইসরায়েলের মধ্যে দীর্ঘদিনের কৌশলগত ও কূটনৈতিক সম্পর্ক থাকলেও এবার সেই সম্পর্ক নিয়ে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি করেছেন ইসরায়েলি-আমেরিকান রাব্বি ইউসেফ মিজরাহি। ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হলে ইহুদিদের ভারতের পরিবর্তে পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নেওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। তাঁর এই বক্তব্য ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা ও প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে ভারত ও হিন্দুধর্ম সম্পর্কে আপত্তিকর মন্তব্য করতে শোনা যায় এই ইহুদি ধর্মগুরুকে। তাঁর যুক্তি, ইহুদি ধর্মীয় গ্রন্থের ব্যাখ্যা অনুযায়ী মূর্তিপূজার পরিবর্তে একেশ্বরবাদে বিশ্বাসীদের সমর্থন করা উচিত।
গত ৩ নভেম্বর ‘নির্বাচন ও বর্তমান ঘটনা’ শিরোনামে দেওয়া এক বক্তব্যে তোরাহসহ বিভিন্ন ইহুদি ধর্মীয় গ্রন্থের প্রসঙ্গ টেনে তিনি এসব মন্তব্য করেন। তাঁর দাবি, ধর্মীয় বিশ্বাসের জায়গা থেকে ইহুদিদের মূর্তিপূজার বিরোধিতা করা উচিত। এ কারণে ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি হলে পাকিস্তানকে সমর্থন করাই তাঁদের জন্য যুক্তিসংগত হবে।
মিজরাহি স্বীকার করেন, পাকিস্তানের সঙ্গে ইসরায়েলের কূটনৈতিক সম্পর্ক বৈরী। তবে তাঁর মতে, ধর্মীয় নীতির কাছে রাজনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্কের গুরুত্ব কম।
তিনি বলেন, ‘যদি ইহুদিদের ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে কোনো একটিকে বেছে নিতে হয়, তবে পাকিস্তানের পক্ষ নেওয়া উচিত। এটি পাকিস্তান ইসরায়েলকে সমর্থন করে বলে নয়, বরং মূর্তিপূজা বনাম বিশুদ্ধ একেশ্বরবাদের ধর্মীয় নীতিগত পার্থক্যের কারণে।’
ইসরায়েল ও ভারতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে তাঁর এ বক্তব্য বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের আমলে দুই দেশের প্রতিরক্ষা, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, বাণিজ্য ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা আরও বিস্তৃত হয়েছে। অন্যদিকে, গাজা যুদ্ধকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা চললেও ভারত দেশটির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছে।
মিজরাহির বক্তব্য প্রকাশ্যে আসার পর ভারতীয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের একাংশ ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের প্রশ্ন, দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকার পরও একজন ইহুদি ধর্মগুরু কীভাবে এমন অবস্থান নিতে পারেন? তবে অনেকে বিষয়টিকে একজন কট্টরপন্থী ব্যক্তির ব্যক্তিগত মতামত হিসেবে বিবেচনা করে একে ইসরায়েলের সামগ্রিক অবস্থান হিসেবে না দেখার আহ্বান জানিয়েছেন।
হিন্দুধর্ম ও গো-পূজা নিয়ে আগের মন্তব্যেও বিতর্ক
হিন্দুধর্ম সম্পর্কে বিতর্কিত মন্তব্যের কারণে ইউসেফ মিজরাহি এর আগেও সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন। গত মাসে হিন্দুদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও গো-পূজা নিয়ে তাঁর কিছু বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওতে নিজের ফেসবুক পেজে কাজ করা এক ভারতীয় হিন্দু ব্যক্তির প্রসঙ্গ তুলে ধরেন তিনি। ওই ব্যক্তি ইহুদি ধর্ম গ্রহণে আগ্রহী বলে উল্লেখ করেন মিজরাহি। তাঁর পারিবারিক ও ধর্মীয় রীতিনীতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে হিন্দুদের গো-সেবা ও গরুর প্রতি শ্রদ্ধার বিষয়টি নিয়ে উপহাস করেন তিনি।
মিজরাহির দাবি, কিছু হিন্দু পরিবারে গরুকে বিশেষভাবে সম্মান করা হয় এবং গোমূত্রও বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা হয়। এমনকি ভারতীয় ফার্মেসিতে গোমূত্র বিক্রির প্রসঙ্গ টেনেও তিনি কটাক্ষ করেন। এসব আচার অনুসরণকারীদের মধ্যে চিকিৎসকেরাও রয়েছেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এ ছাড়া দিল্লির রাস্তায় গরুর অবস্থান ও যানজট নিয়েও বিদ্রূপ করেন এই ধর্মগুরু। বক্তব্যের একপর্যায়ে তিনি বলেন, ‘ঈশ্বরকে ধন্যবাদ যে তিনি আমাকে ভারতীয়দের মতো বানাননি।’ তাঁর এই মন্তব্য নিয়েও ভারত ও ইসরায়েলসহ বিভিন্ন মহলে সমালোচনা তৈরি হয়।
সর্বশেষ ৩ নভেম্বরের বক্তব্যে মিজরাহি ভারত ও ইসরায়েলের মধ্যে অস্ত্র কেনাবেচা, গোয়েন্দা সহযোগিতা এবং অর্থনৈতিক সম্পর্কের বিষয়টি উল্লেখ করেন। তবে এসব কৌশলগত সম্পর্কের চেয়ে ধর্মীয় বিশ্বাসকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার পক্ষে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন তিনি।
তাঁর সাম্প্রতিক মন্তব্যের পর ভারত-ইসরায়েল সম্পর্কের পাশাপাশি ধর্মীয় বিশ্বাস ও রাজনৈতিক মিত্রতার পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।



