স্বাস্থ্য

স্বাস্থ্যসেবার পরবর্তী বড় পরিবর্তন হবে রোগীর অভিজ্ঞতায়

স্বাস্থ্যসেবার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা হলে আমরা সাধারণত নতুন প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, আধুনিক যন্ত্রপাতি কিংবা উন্নত চিকিৎসা-পদ্ধতির কথা বলি। এগুলো অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ডিজিটাল, ব্র্যান্ড ও জনসংযোগ নিয়ে কাজ করতে গিয়ে আমার কাছে একটি বিষয় ক্রমেই স্পষ্ট হয়েছে—স্বাস্থ্যসেবার পরবর্তী বড় পরিবর্তন শুধু চিকিৎসা প্রযুক্তিতে হবে না; হবে রোগীর অভিজ্ঞতায়।

কারণ একটি হাসপাতালের সক্ষমতা শুধু তার কী আছে, তা দিয়ে বোঝা যায় না। একজন রোগীর জন্য সেই সক্ষমতা কতটা সহজে ব্যবহারযোগ্য, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একজন মানুষ হাসপাতালে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগেই তার চিকিৎসাযাত্রা শুরু হয়ে যায়। তিনি চিকিৎসকের নাম খুঁজছেন, রোগ সম্পর্কে তথ্য পড়ছেন, হাসপাতালের ওয়েবসাইট দেখছেন, ফোন করছেন, সাক্ষাতের সময় নিচ্ছেন। এরপর শুরু হয় নিবন্ধন, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, চিকিৎসকের পরামর্শ, প্রয়োজন হলে ভর্তি এবং পরবর্তী পরিচর্যা। এই পুরো পথটিই তাঁর অভিজ্ঞতা।

আমার কাছে এখানেই স্বাস্থ্যসেবার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের জায়গা। রোগী শুধু চিকিৎসা চান না; তিনি চিকিৎসা পাওয়ার পথটিও সহজ চান। তথ্য কোথায় পাবেন, কার সঙ্গে যোগাযোগ করবেন, কোথায় যেতে হবে, কতক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে, পরবর্তী ধাপ কী—এসব প্রশ্নের উত্তর যত পরিষ্কার হবে, তাঁর অনিশ্চয়তাও তত কমবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবার বৈশিষ্ট্য হিসেবে কার্যকর ও নিরাপদ চিকিৎসার পাশাপাশি মানুষকেন্দ্রিক, সময়োপযোগী, সমন্বিত ও দক্ষ সেবার ওপর গুরুত্ব দেয়। রোগীর অভিজ্ঞতা নিয়মিত পরিমাপ করে সেবার মান উন্নত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও সংস্থাটি বলছে।

আমার মনে হয়, এখানেই হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার প্রচলিত চিন্তায় একটি পরিবর্তন প্রয়োজন। আমরা অনেক সময় হাসপাতালের দিক থেকে ভাবি—আমাদের কতগুলো বিভাগ আছে, কতজন বিশেষজ্ঞ আছেন, কী প্রযুক্তি আছে, কী সেবা দেওয়া হয়। কিন্তু রোগীর দিক থেকে প্রশ্নটি ভিন্ন—

“আমার প্রয়োজনের সময়ে এগুলো আমার জন্য কতটা সহজে কাজ করছে?” এই পার্থক্যটি খুব গুরুত্বপূর্ণ।

একটি হাসপাতালের ওয়েবসাইটে সব তথ্য থাকতে পারে, কিন্তু রোগী যদি প্রয়োজনীয় তথ্য খুঁজে না পান, তাহলে তথ্য থাকার মূল্য কমে যায়। অনলাইন সাক্ষাতের ব্যবস্থা থাকতে পারে, কিন্তু প্রক্রিয়াটি জটিল হলে প্রযুক্তি রোগীর সময় বাঁচায় না। অনেক বিভাগ ও বিশেষজ্ঞ থাকতে পারেন, কিন্তু রোগী যদি বুঝতে না পারেন কার কাছে যাবেন, তাহলে সেই সক্ষমতাও তাঁর কাছে পুরোপুরি পৌঁছায় না।

তাই আমি মনে করি, স্বাস্থ্যসেবায় ভালো প্রযুক্তি মানে শুধু নতুন প্রযুক্তি নয়; ভালো প্রযুক্তি মানে রোগীর জন্য কম জটিলতা।

একইভাবে, রোগীর অভিজ্ঞতাকে শুধু সন্তুষ্টির একটি সংখ্যা হিসেবে দেখাও যথেষ্ট নয়। কতজন রোগী সন্তুষ্ট—এটি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, কোথায় তারা সমস্যায় পড়ছেন, কোথায় সময় নষ্ট হচ্ছে, কোন তথ্য বারবার জানতে হচ্ছে এবং কোন ধাপে তাদের অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে।

একজন রোগী যদি একই প্রশ্ন বারবার করেন, সেটিকে শুধু একটি প্রশ্ন হিসেবে দেখা উচিত নয়। এটি হয়তো প্রতিষ্ঠানের তথ্যব্যবস্থার একটি সংকেত। কোনো নির্দিষ্ট ধাপে বারবার অপেক্ষা হলে সেটি শুধু রোগীর অসুবিধা নয়; প্রক্রিয়াটি পুনর্বিবেচনার একটি সুযোগ।

রোগীর অভিজ্ঞতা তাই শুধু প্রতিক্রিয়া নয়; এটি প্রতিষ্ঠানের জন্য তথ্য।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৫ সালের রোগীর অভিজ্ঞতা পরিমাপের কাঠামোতেও সহজে প্রথম যোগাযোগ, ধারাবাহিকতা, সমন্বয়, মানুষকেন্দ্রিকতা, চিকিৎসা পরিকল্পনা এবং সামগ্রিক অভিজ্ঞতাকে পরিমাপের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে ধরা হয়েছে।

এখানে নেতৃত্বের একটি নতুন দায়িত্ব তৈরি হয়। শুধু রোগীর অভিযোগ সমাধান করা নয়; অভিযোগ তৈরি হওয়ার কারণও বোঝা। শুধু অপেক্ষার সময় কমানো নয়; কেন অপেক্ষা তৈরি হচ্ছে, সেটিও দেখা। শুধু তথ্য দেওয়া নয়; রোগী সেই তথ্য বুঝতে পারছেন কি না, সেটিও নিশ্চিত করা।

আমার দৃষ্টিতে, রোগীর অভিজ্ঞতার দায়িত্ব কোনো একটি বিভাগের নয়। ডিজিটাল দল তথ্য সহজ করতে পারে, বিপণন মানুষের কাছে সঠিক প্রত্যাশা তৈরি করতে পারে, জনসংযোগ তথ্য পৌঁছে দিতে পারে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত চিকিৎসক, নার্স, রোগীসেবা, নিবন্ধন, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, বিলিং, নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা—সব বিভাগ মিলে একজন রোগীর অভিজ্ঞতা তৈরি করে।

রোগী বিভাগ দেখে না; রোগী পুরো প্রতিষ্ঠানটিকে একটি অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখেন।

এ কারণেই ভবিষ্যতের হাসপাতালকে শুধু চিকিৎসার মান দিয়ে নয়, রোগীর পুরো পথ দিয়ে দেখতে হবে।

লেখক: মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিন মামুন, হেড অব ডিজিটাল, ব্র্যান্ড অ্যান্ড পিআর, এভারকেয়ার হাসপাতাল, চট্টগ্রাম

সংশ্লিষ্ট খবর

Back to top button