ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফার্স্ট ক্লাশ ফার্স্ট পাওয়া রমার ঠাঁই এখন বৃদ্ধাশ্রমে

বাংলা টিভি ডেস্ক: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগ থেকে অনার্স ও এম.কম—দুই পরীক্ষাতেই প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়েছিলেন রমা রোকসানা। কর্মজীবনে ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। কিন্তু জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে সেই মেধাবী নারীকে কাটাতে হচ্ছে নিঃসঙ্গ জীবন। স্বামীর মৃত্যুর পর ৬৭ বছর বয়সে বরিশাল নগরের কাউনিয়ার একটি বৃদ্ধাশ্রমে আশ্রয় নিয়েছেন তিনি।
তিন ভাইয়ের একমাত্র বোন রমা রোকসানার অভিযোগ, বিপদের সময়ে ভাইদের কাছে আশ্রয় চেয়েও সাড়া পাননি তিনি। বরং তাঁকে বৃদ্ধাশ্রমে চলে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। একের পর এক স্বজনের কাছে আশ্রয় চেয়েও প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর শেষ পর্যন্ত মামার বাড়ির আত্মীয়রা তাঁকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে যান।
নিজের অসহায় অবস্থার কথা বলতে গিয়ে রমা রোকসানা বলেন, ‘থাকি, আর কী উপায়! ভাইরা কোনোদিন ডাকবে না। যতবার বলছি যে আমি কোথায় যাব, বলে কিনা, না, আমাদের বৃদ্ধাশ্রমে যেতে হবে। আমরা রাখব না। আমার বউ-ছেলের ঝামেলা।’
১৯৭৫ সালে সিদ্ধেশ্বরী স্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং ১৯৭৭ সালে হলিক্রস কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন রমা। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগে ভর্তি হন। ১৯৮২ সালে অনার্স ও এম.কম—উভয় পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করে আইসিবিতে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন।
প্রায় আট বছর চাকরি করার পর অসুস্থ মায়ের দেখাশোনার জন্য কর্মজীবন ছেড়ে দেন তিনি। রমার ভাষ্য অনুযায়ী, ১৯৯৯ সালে মায়ের মৃত্যুর পর তাঁর জীবনে নানা পরিবর্তন আসতে থাকে। ২০০৩ সালে হানিফ হাওলাদার নামের এক ব্যক্তিকে বিয়ে করেন তিনি। ওই ব্যক্তির আগের সংসারে স্ত্রী ও সন্তান ছিল।
রমা জানান, স্বামীর ব্যবসার প্রয়োজনে নিজের সঞ্চয় থেকে ১৭ লাখ টাকা দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সেই আর্থিক সহযোগিতার পরও জীবনে স্থায়ী সচ্ছলতা আসেনি। প্রায় তিন বছর আগে স্বামীর মৃত্যুর পর তাঁর জীবনে নেমে আসে আরও অনিশ্চয়তা।
স্বামীর সঙ্গে কাটানো দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করে রমা বলেন, ‘ভালোবাসত লোকটা। স্বামী ২০ বছর সংসার করার পর মারা যায়।’
স্বামীর মৃত্যুর পর কখনো দেবরের পরিবারে, কখনো খালাতো বোনের বাসায় আশ্রয় নিয়ে দিন কাটিয়েছেন তিনি। এভাবে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ঘুরতে ঘুরতে একসময় নিজের শেষ সম্বলটুকু নিয়েও অনিশ্চয়তায় পড়েন রমা। তাঁর অভিযোগ, খালাতো বোনের কাছে রাখা ৯০ হাজার টাকাও ফেরত পাননি।
এরপর ভাইদের কাছে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করেন তিনি। কিন্তু তাঁর দাবি, ভাইয়েরা তাঁকে নিজেদের কাছে রাখতে রাজি হননি। বরং বৃদ্ধাশ্রমে যাওয়ার পরামর্শ দেন। শেষ পর্যন্ত মামার বাড়িতে চার দিন থাকার পর স্বজনেরা তাঁকে বরিশালের একটি বৃদ্ধাশ্রমে রেখে যান। সেখানে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে বসবাস করছেন তিনি।
নিজের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে রমা রোকসানা বলেন, ‘ভাইয়ের কাছে গিয়ে বলি যে আমি আর থাকব না। কয়, আপনি বৃদ্ধাশ্রমে চলে যান। পরে আমি বাধ্য হয়ে আমার মামার বাড়ি আসি। চার দিন থাকার পর মামারা এখানে দিয়ে আসে। এক মাসের একটু বেশি হলো এখানে থাকি। তো মনটা মাঝে মাঝে খারাপ লাগে। অনেক বড় বড় আত্মীয়স্বজন, সবাই লেখাপড়া করেছে, সবার বাড়ি-গাড়ি আছে। কেউ রাখে না। এই বুড়া বয়সে এখানে থাকি।’
পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে রমার তোলা অভিযোগের বিষয়ে তাঁদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বৃদ্ধাশ্রমের পরিচালক শাখায়েত হোসেন জানান, বর্তমানে রমা রোকসানার দেখাশোনা করছেন তাঁরা। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, রমা শিক্ষিত ও সচ্ছল পরিবারের সন্তান। ঢাকার মগবাজার এলাকায় তাঁর মা-বাবার বাড়ি ছিল। স্বামীর মৃত্যুর পর আগের সংসারের ছেলেদের হাতে নির্যাতন ও জোরজবরদস্তির শিকার হয়ে তাঁকে বাড়ি ছাড়তে হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
শাখায়েত হোসেন বলেন, ‘ভালো শিক্ষিত পরিবার থেকে আসা, ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান উনি। ঢাকা মগবাজার উনার মা-বাবার এলাকা। হাজবেন্ড মারা যাওয়ার পরে আগের ঘরের যে ছেলেরা আছে, তারা এই রমা বেগমকে জোর-জুলুম করে ঘর থেকে বের করে দিয়েছে। তার পরিপ্রেক্ষিতে উনি এখন আশ্রয়হীন হয়ে গেছেন।’
বৃদ্ধাশ্রমের কার্যক্রম সম্পর্কে তিনি আরও বলেন, ‘আমার এই বৃদ্ধাশ্রমটি মূলত অসহায় মানুষদের জন্য। আমরা তাদের সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে লালন-পালন করি। বর্তমানে আমার এখানে ৭০ জন বৃদ্ধ মা আছেন, মানুষের সাহায্য-সহযোগিতায় তাদের দেখাশোনা করা হয়।’
একসময় মেধা ও পরিশ্রম দিয়ে শিক্ষাজীবনে অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেছিলেন রমা রোকসানা। কর্মজীবনে নিজের অবস্থান তৈরি করেছিলেন, আবার অসুস্থ মায়ের সেবার জন্য ত্যাগ করেছিলেন চাকরিও। অথচ জীবনের শেষবেলায় এসে তাঁকে কাটাতে হচ্ছে স্বজনদের থেকে দূরে, বৃদ্ধাশ্রমে।
রমা রোকসানার জীবনকাহিনি বার্ধক্যে নিরাপদ আশ্রয়, পরিবারের দায়িত্ববোধ এবং অসহায় মানুষের প্রতি সামাজিক দায়বদ্ধতার বিষয়গুলো নতুন করে সামনে এনেছে। তাঁর মতো একজন মানুষের জীবনের এমন পরিণতি স্বজনদের দায়িত্ব ও প্রবীণদের নিরাপত্তা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও তুলে ধরে।



