
বাংলা টিভি ডেস্ক: দীর্ঘ ৯ মাসের বিরতি। মস্তিষ্কে টিউমার, অস্ত্রোপচার, একের পর এক চিকিৎসা আর কেমোথেরাপির কঠিন অধ্যায় পেরিয়ে আবারও ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালেন অভিনেত্রী তানিয়া বৃষ্টি। অসুস্থতার কারণে দীর্ঘদিন অভিনয় থেকে দূরে থাকলেও মনের ভেতর ছিল কাজে ফেরার প্রবল ইচ্ছা। অবশেষে সেই অপেক্ষার অবসান হলো। নতুন উদ্যমে অভিনয়ে ফিরেছেন তিনি।
ইকসান রনির পরিচালনায় ‘অংশীদার’ নাটকের শুটিংয়ের মধ্য দিয়ে কাজে ফিরেছেন তানিয়া। গত ২৬ অক্টোবর শুরু হয় নাটকটির শুটিং। টানা দুই দিনের শুটিংয়ে নিজের অংশের কাজ শেষ করেন তিনি।
দীর্ঘদিন পর শুটিং সেটে ফিরে সহকর্মীদের ভালোবাসা ও আন্তরিকতায় আবেগাপ্লুত হয়েছেন এই অভিনেত্রী। ফেরার অনুভূতি জানিয়ে তানিয়া বৃষ্টি বলেন, শুটিংয়ে সবার আন্তরিকতা তাকে আবেগাপ্লুত করেছে। পরিচালক থেকে শুরু করে সেটের প্রত্যেকেই তার প্রতি বিশেষ যত্ন নিয়েছেন।
সবার ভালোবাসা ও সহযোগিতা তাকে নতুন করে কাজ করার উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা দিয়েছে বলেও জানান তিনি। দীর্ঘ বিরতির পর এমন আন্তরিক পরিবেশে ফিরতে পেরে ভীষণ ভালো লেগেছে তার। সহকর্মীদের আচরণে মনে হয়েছে, তারা তার ফিরে আসার অপেক্ষায় ছিলেন।
এর আগে গত ৩ অক্টোবর ফেসবুক লাইভে অভিনয়ে ফেরার ইচ্ছার কথা জানিয়েছিলেন তানিয়া। তখন বলেছিলেন, তিনি অবশ্যই অভিনয়ে ফিরতে চান এবং চলতি মাস থেকেই কাজ শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। সে অনুযায়ী কথাবার্তাও চলছিল।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন তানিয়া বৃষ্টি। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তার মস্তিষ্কে টিউমার ধরা পড়ে। ফেব্রুয়ারিতেই অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে টিউমার অপসারণ করা হয়। এরপর উন্নত চিকিৎসার জন্য ৯ মার্চ ভারতের চেন্নাইয়ে যান তিনি। সেখানে আরও দুটি অস্ত্রোপচার করতে হয় তাকে। পরে শুরু হয় কেমোথেরাপি।
অসুস্থতার সেই কঠিন সময়ের কথা স্মরণ করে আগের ফেসবুক লাইভে তানিয়া জানিয়েছিলেন, ‘আমি হয়তো না-ও ফিরতে পারতাম, এমন শারীরিক অবস্থা ছিল। এখন আগের চেয়ে আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি।’
দীর্ঘ চিকিৎসার সময় অভিনয়কে ভীষণ মিস করেছেন বলেও জানিয়েছিলেন তিনি।
এদিকে, তানিয়ার প্রত্যাবর্তনের নাটক ‘অংশীদার’-এর গল্পে উঠে এসেছে নারীর উত্তরাধিকার ও পারিবারিক সম্পত্তিতে মেয়েদের অধিকারের বিষয়টি। গল্পে দেখা যাবে, বাবার মৃত্যুর পর দুই বোনকে পৈতৃক সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করার চেষ্টা করেন তাদের চাচা ও পরিবারের অন্য সদস্যরা। একপর্যায়ে নিজের ন্যায্য অধিকার আদায়ে প্রতিবাদী হয়ে ওঠেন বড় বোন।
ইকসান রনির গল্প, চিত্রনাট্য ও পরিচালনায় নির্মিত নাটকটির সংলাপ লিখেছেন ফারুক আহমেদ রানা ও নন্দী জুয়েল। তানিয়া বৃষ্টি ছাড়াও এতে অভিনয় করেছেন ফজলুর রহমান বাবু, ডলি জহুর, নন্দী জুয়েল, আশরাফুল আশীষ, পংকজ মজুমদার, দেলোয়ার উদ্দিন, সিদ্দিক মাস্টার, কাকন চৌধুরী ও তাসমিয়াহ টিনা।
নির্মাতা জানিয়েছেন, নাটকটি শিগগিরই প্রচারিত হবে। পরে দেখা যাবে নির্দিষ্ট ইউটিউব চ্যানেলে।
দীর্ঘ চিকিৎসা আর অনিশ্চয়তার সময় পেরিয়ে তানিয়া বৃষ্টির এই ফেরা তাই শুধু নতুন একটি নাটকের শুটিং শুরু নয়, বরং তার অভিনয়জীবনে নতুন করে পথচলারও সূচনা।
উল্লেখ্য, তানিয়ার অসুস্থতার শুরু গত বছরের ডিসেম্বরে। একটি নাটকের শুটিং চলাকালে হঠাৎ তীব্র মাথা ব্যথা শুরু হয় তার। টানা চার দিন অসুস্থতা নিয়েই কাজ চালিয়ে যান। পঞ্চম দিনে শুরু হয় প্রচণ্ড বমি। এরপর তাকে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরদিনই জানা যায়, মস্তিষ্কে টিউমার হয়েছে।
শুরুতে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সুস্থ হয়ে ওঠার আশা থাকলেও পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে পড়ে। ভারতের চেন্নাইয়ের এমজিএম হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গিয়ে এক অনকোলজিস্টের কাছ থেকে আয়ু নিয়ে ভয়াবহ পূর্বাভাস শুনতে হয় তাকে। চিকিৎসক জানান, তার আয়ু হয়তো আর সাড়ে চার থেকে পাঁচ বছর। এমন কথা শোনার পর মানসিকভাবে বড় ধাক্কা খান অভিনেত্রী।
প্রথম অস্ত্রোপচারের আগে ঢাকায় থাকতেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন তানিয়া। পরিবারের সদস্য ও সহকর্মীদের সঙ্গে কথাবার্তাতেও ছিল বিদায়ের সুর। পরবর্তী সময়ে দ্বিতীয় অস্ত্রোপচারের সময় শারীরিক অবস্থার আরো অবনতি হয়। একপর্যায়ে তাকে লাইফ সাপোর্টে রাখতে হয়। জ্ঞান ফেরার পর আইসিইউর পরিবেশ দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন তিনি। তবে পাশে মা ও বোনকে দেখে কিছুটা সাহস পান।
অসুস্থতার পুরো সময়ে মায়ের ভূমিকার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন তানিয়া। বাবা না থাকায় রাত জেগে মেয়ের সেবা করেছেন মা। পরিবারের সদস্যদের প্রার্থনা ও ভালোবাসা তাকে কঠিন সময় পার করার শক্তি জুগিয়েছে। এ ছাড়া সহকর্মী মোশাররফ করিম, নিলয় আলমগীর এবং প্রযোজক আলী বশীরসহ নাট্যাঙ্গনের অনেকেই নিয়মিত তার খোঁজখবর নিয়েছেন।
অসুস্থতার সময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল তার মৃত্যুর গুজবও। তবে সব প্রতিকূলতা পেছনে ফেলে এখন নতুন করে জীবন ও কাজের স্বপ্ন দেখছেন তানিয়া। ২০১২ সালে ভালোবাসা থেকেই অভিনয়জগতে যাত্রা শুরু করেছিলেন তিনি। এবারও সেই ভালোবাসা আর আগের উদ্দীপনা নিয়েই ক্যারিয়ারকে নতুন করে এগিয়ে নিতে চান।
জটিল রোগে আক্রান্ত রোগীদের উদ্দেশেও দিয়েছেন সাহসী বার্তা। তার মতে, রোগের নাম শুনেই মনোবল হারালে চলবে না। মানসিক দৃঢ়তা, সঠিক খাদ্যাভ্যাস, চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলা এবং পরিবারের সঙ্গে ইতিবাচক সময় কাটানো জরুরি। কঠিন সময়েও আশা না হারিয়ে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন এই অভিনেত্রী।



