বাংলাদেশ

‘‎আমাকেও নিয়ে যাও’, সেনাসদস্য স্বামীকে হারিয়ে স্ত্রীর আহাজারি

ফরিদপুর প্রতিনিধি: সেনাবাহিনীর সঙ্গে ছিল পরিবারের গভীর সম্পর্ক। বাবা অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য, ছোট ভাইও কর্মরত রয়েছেন একই বাহিনীতে। পরিবারের বড় ছেলে তিতাস শেখ নিজেও ছিলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্য। তবে টেকনাফে সন্ত্রাসীদের গুলিতে মাত্র ২৮ বছর বয়সে থেমে গেল তাঁর জীবন। প্রিয়জনকে হারিয়ে শোকে ভেঙে পড়েছে পুরো পরিবার। সন্তানের মৃত্যুতে মায়ের আহাজারি আর স্বামী হারানোর বেদনায় স্তব্ধ স্ত্রীর কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে বাড়ির পরিবেশ।

শুক্রবার (৬ নভেম্বর) সকালে ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার লস্করদিয়া গ্রামে তিতাসের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় শোকাবহ পরিস্থিতি। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে সবার বড় ছিলেন তিতাস। তিনি সেনাবাহিনীর ১ বীর ইউনিটের সদস্য হিসেবে টেকনাফের রঙ্গীখালী আর্মি ক্যাম্পে দায়িত্ব পালন করছিলেন।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে সৈনিক পদে যোগ দেন তিতাস শেখ। চার বছর আগে পাশের গ্রামের সুমাইয়া আক্তারের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। তবে দীর্ঘ চার বছরের দাম্পত্য জীবনে তাঁদের কোনো সন্তান হয়নি। আগামী ডিসেম্বর মাসে স্ত্রীকে নিজের কর্মস্থলে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন তিতাস। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিণতিতে তাঁর সেই ইচ্ছা আর পূরণ হলো না।

স্বামীকে হারিয়ে শোকে ভেঙে পড়েছেন সুমাইয়া আক্তার। বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ে তিনি বলছেন, ‘আমাকেও নিয়ে যাও, আমি কেমনে থাকব! আমার কোনো অস্তিত্ব রইল না! আল্লাহ, আমি এখন কী করব!’

অন্যদিকে বড় ছেলেকে হারিয়ে দিশেহারা মা রেখা বেগম। তিনি জানান, গত বুধবার রাতে ছেলের সঙ্গে তাঁর সর্বশেষ কথা হয়েছিল। সে সময় তিতাস তাঁকে বলেছিলেন, ‘আগামীকাল (বৃহস্পতিবার) বিকেলে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযানে যাব, দোয়া কইরো মা।’ ছেলের মুখে এমন কথা শুনেও যে সেটিই তাঁদের শেষ কথোপকথন হবে, তা কল্পনাও করেননি তিনি। সন্তানের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর থেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েছেন মা।

আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে টেকনাফে মানব পাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে যৌথবাহিনীর অভিযান চলছিল। এ সময় পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের ছোড়া গুলিতে গুরুতর আহত হন সেনাসদস্য তিতাস শেখ। তাঁর বুকের বাঁ পাশে গুলি লাগে।

আহত অবস্থায় প্রথমে তাঁকে লেদা আইআরসি রোহিঙ্গা হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য বেসামরিক অ্যাম্বুলেন্সে রামু সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) স্থানান্তর করা হয়। পরে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত ৮টা ৪৮ মিনিটে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

তিতাসের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই তাঁর গ্রামের বাড়িতে শোকের আবহ বিরাজ করছে। স্বজন ও স্থানীয়দের মধ্যেও নেমে এসেছে গভীর শোক। পরিবারের সদস্যরা জানান, তাঁর মরদেহ রামু সিএমএইচে রাখা হয়েছে। মরদেহ গ্রহণ করতে সেখানে গেছেন তাঁর ছোট ভাই সেনাসদস্য আকরাম হোসেন।

নগরকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেজওয়ানা আফরিন জানান, সেনাবাহিনীর আনুষ্ঠানিকতা শেষে হেলিকপ্টারে করে মরদেহটি বিকেলে পৌঁছানোর কথা রয়েছে বলে তাঁকে জানানো হয়েছে। এরপর বিকেল ৪টার মধ্যে গ্রামের বাড়িতে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনারসহ প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হবে। পরে পরিবারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দাফন করা হবে।

সংশ্লিষ্ট খবর

Back to top button