দেশবাংলাস্লাইডার

হারাতে বসেছে শিল্পের কারিগর খ্যাত বাবুই পাখি

দিনদিন হারিয়ে যেতে বসেছে শিল্পের কারিগর খ্যাত বাবুই পাখি ও তার সুদর্শন বাসা। এসব বাসা শুধু শৈল্পিক নিদর্শনই ছিলনা, মানুষের মনে চিন্তার খোরাক এবং আত্মনির্ভরশীল হতে উৎসাহ যোগাত। একই সাথে এ পাখি যেমন শিল্পী তেমন ঘুম জাগানিয়া। চমৎকার শৈল্পিক সূরে মানুষের ঘুম ভাঙ্গাতো। কালের বিবর্তনে ও পরিবেশ বিপর্যয়ের ফলে আজ বিলুপ্তির পথে।

একসময় মেহেরপুরের গাংনী উপজেলায় বিভিন্ন প্রজাতির বাবুই পাখি দেখা যেত। আর ভিন্ন প্রজাতির বাবুই দেখতে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ভীড় করতেন পাখি প্রেমীরা। দেশি, দাগি ও বাংলা এই তিন প্রজাতির বাবুইয়ের দেখা মিলত বেশি। তবে বাংলা ও দাগি বাবুই এখন বিলুপ্তির পথে। বর্তমানে কিছু দেশি বাবুই দেখা যায়। বাসা তৈরির জন্য এদের প্রথম পছন্দ তালগাছ। এরপর নারিকেল, সুপারি ও খেজুর গাছ।

এরা খড়ের ফালি, ধানের পাতা ও কাশবনের লতাপাতা দিয়ে দলবেঁধে বাসাবাঁধে। বাসার গঠন দেখে মনে হয় শিল্পের নিপুন কারুকাজ। বাসা যেমন দৃষ্টিনন্দন, তেমনি মজবুত। দেখে মনে হয় শিল্পের নিপুন কারুকাজ। শুরুতে বাসায় দুটি নিম্নমুখী গর্ত রাখে। অর্ধেক বাসা বাধার পর তার সঙ্গীকে খোঁজে। স্ত্রী বাবুইটির পছন্দ হলে মাত্র চার দিনে বাসা বাঁধার কাজ শেষ করে। বাসার নিম্নমুখী একটি গর্ত বন্ধ করে ডিম রাখার জায়গা করে নেয়। অন্যটি খোলা রেখে দেয় প্রবেশ ও প্রস্থানের জন্য।

বাসার ভিতরে বাইরে কাদা লাগিয়ে রাখে ফলে প্রবল ঝড়ে বা বাতাসেও টিকে থাকে তাদের বাসা। রাতে বাসা আলোকিত করার জন্য জোনাকী পোকা ধরে এনে বাসায় রাখে। সাথী বানানোর জন্য কত কিছুই না করে পুরুষ বাবুই। স্ত্রী বাবুইকে নিজের প্রতি আকর্ষণ করাতে খাল-বিল ও ডোবায় গোসল সেরে ফুর্তিতে নেচে বেড়ায় গাছের ডালে ডালে।

সাধারণত বীজভোজী বাবুইয়ের প্রজনণ মৌসুম মে থেকে আগস্ট।। একটি পুরুষ পাখির একাধিক বাসা ও পরিবার থাকতে পারে। বাবুই পাখি দুই থেকে চারটি ডিম দেয়। স্ত্রী বাবুই ডিমে তা দেয়। দুই সপ্তাহের মধ্যে বাচ্চা ফোটে। তিন সপ্তাহ পর বাচ্চা উড়ে যায়। এরা মূলত বীজভোজী পাখি। তাই এদের ঠোঁটের আকৃতি সহজে বীজ ভক্ষণের উপযোগী চোঙাকার। আর ঠোঁটের গোড়ার দিকটা মোটা। এরা সাধারণত খুঁটে খুঁটে বিভিন্ন ধরনের বীজ, ধান, ভাত,পোকা, ঘাস, ছোট উদ্ভিদের পাতা, ফুলের মধু-রেণু ইত্যাদি খেয়ে জীবনধারণ করে।

কিন্তু বাসা বাঁধার জায়গা না থাকায় এ পাখি বংশ বৃদ্ধি করতে পারেনি। এছাড়া ক্ষেতে ও বীজতলায় কীটনাশক ব্যবহারের কারণে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ বাবুই মারা যায়। তাই দিনে দিনে এলাকা থেকে বিদায় নিয়েছে বাবুই পাখি ও নিপুন শৈল্পিকতায় ভরপুর বাবুই পাখির বাসা।

তারপরেও আজো ভাটপাড়া নীলকুঠিতে আসা দর্শনার্থীরা বাবুইয়ের বাসা খুঁজে ফেরেন এদিক সেদিক। স্থানীয়  দর্শনার্থী জানান, লোকমুখে শুনে বাবুই পাখির বাসা দেখতে এসেছি এখানে সাথে আমার ছোট বাচ্চাকেউ নিয়ে এসেছি একটি নিখুত ‍শিল্পকর্ম দেখাবো বলে। কিন্তু কোথায় হারালো আমার সেই ছোট বেলার কারিগর।

প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষাকারী বাবুই পাখির বংশ বিস্তারের লক্ষে তাল, খেজুর ও নারকেল গাছ রোপনের পরামর্শ দিয়ে জীব বিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর রিনা আকতার বলেন, এক সময় সোনালী ও সবুজ রঙ্গের বাবুই পাখির কিচির মিচির ডাক শোনা যেত সন্ধ্যা ও সকালে। এ পাখি যেমন শিল্পী তেমন ঘুম জাগানিয়া। চমৎকার শৈল্পিক সূরে মানুষের ঘুম ভাঙ্গাতো।

তিনি আরও বলেন, এখন নেই কোন বড় তাল আর নারকেল গাছ। বাসা বাধার জায়গা না থাকায় এখন আর বংশ বৃদ্ধি করতে পারছে না। আর যেহেতু বাবুই পাখি সাধারণত খুঁটে খুঁটে বিভিন্ন ধরনের বীজ, ধান, ভাত, পোকা, ঘাস, ছোট উদ্ভিদের পাতা, ফুলের মধু-রেণু ইত্যাদি খেয়ে জীবনধারণ করে। এখন কৃষকরা ক্ষেতে ও বীজতলায় কীটনাশক ব্যবহার করায় বাবুই পাখি মারা যাচ্ছে। বংশ রক্ষার্থে তারা এলাকা ত্যাগ করছে। তাই পরিবেশ ও পাখি সংরক্ষণের জন্য তাল নারকেল গাছ রোপন জরুরী।

বাংলাটিভি/ সৌরভ নূর

সংশ্লিষ্ট খবর

Back to top button
Close