বাংলাদেশঅপরাধ

১৫ সহযোগীসহ ভুয়া আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানী সাইফুল আটক

আন্তর্জাতিক মানের বিজ্ঞানীর ভুয়া পরিচয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব-প্রতিকার, পাওয়ার প্ল্যান্ট প্রজেক্ট, করোনা প্রতিরোধ ব্যবস্থা ও অন্যান্য প্রজেক্ট বাস্তবায়নের নামে কোটি কোটি টাকা ও জমি আত্মসাতকারী চক্রের মূলহোতা সাইফুল ইসলাম ওরফে বিজ্ঞনী সাইফুল বা সায়েন্টিস্ট সাইফুল সহ ১৬ জনকে ঢাকা ও টাঙ্গাইল এর বিভিন্ন স্থান থেকে অস্ত্র ও মাদকসহ আটক করেছে র‌্যাব।

সাম্প্রতিক সময়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ও প্রতিকার বিশ্বব্যাপী একটি বহুল আলোচিত বিষয় । এই তথ্যকে পুঁজি করে একটি চক্র ভুয়া বিজ্ঞানী পরিচয়ে প্রতারণার ফাঁদ তৈরী করেছে বলে র‌্যাবের গোয়েন্দারা জানতে পারে। বিজ্ঞানীর ভূয়া পরিচয়ে জ্বালানীবিহীন জেনারেটর তৈরী ও পাওয়ার প্ল্যান্ট স্থাপন, জলবায়ু পরিবর্তনের উপর গবেষণা ও প্রভাব প্রতিকার প্রজেক্ট এবং এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে করোনাকে পুঁজি করে করোনা প্রতিরোধক কয়েল উদ্ভাবনসহ অন্যান্য অভিনব আবিষ্কারের ভূয়া প্রজেক্ট বাস্তবায়নের নামে প্রতারণা করছে। চক্রটি দেশী বিদেশী সংস্থা ও নেতৃবৃন্দের সহায়তা ও ফান্ড প্রাপ্তির কথা বলে; দেশের বিভিন্ন প্রান্তের জনাসাধারণকে বিনিয়োগে প্রলুব্ধ করে প্রতারণার কৌশল অবলম্বন করে।

ইতিমধ্যে বেশ কয়েকজন ভূক্তভোগীর অভিযোগ র‌্যাব কর্তৃক গৃহিত হয়। বর্ণিত প্রেক্ষাপটে র‌্যাব ছায়াতদন্ত শুরু করে এবং গোয়েন্দা নজরদারী বৃদ্ধি করে। এরই ধারাবাহিকতায় গত ১৫ জুন (মঙ্গলবার) থেকে আজ সকাল পর্যন্ত র‌্যাব সদর দপ্তরের গোয়েন্দা শাখা ও র‌্যাব-১, উত্তরা, ঢাকা এর একটি দল গোপন সংবাদের ভিত্তিতে রাজধানীর উত্তরা এলাকার প্রতারক সংগঠন “রাজা-বাদশা” গ্রুপের নতুন কার্যালয়ে অভিযান পরিচালনা করে প্রতারক চক্রের মূলহোতা সাইফুল ইসলামসহ ১৬ জনকে আটক করে র‍্যাব।

অভিযানে ১টি বিদেশী পিস্তল, ১টি ম্যাগাজিন, ২ রাউন্ড গোলাবারুদ, ২ বোতল বিদেশী মদ, ৬টি সীল, নগদ ৪৫ হাজার ৪৬০ টাকা, ২০টি মোবাইল ফোন, ১৪টি চেক বই, ১২টি ভিজিটিং কার্ড, ৬ টি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের চিঠি, বিভিন্ন মূল্যের ১২১টি জাল স্ট্যাম্প, ৩টি চুক্তিনামা দলিল, ৩টি বই এবং ৯টি স্বাক্ষরিত চেক ও বিদেশী নেতৃবৃন্দের সাথে পত্রালাপের ভূয়া কপি উদ্ধার করা হয়।

সাইফুল ইসলাম এই চক্রের মূল হোতা। সে “রাজা-বাদশা গ্রুপ” নামে একটি ভুয়া সংগঠন তৈরী করে ২০১১ সাল হতে প্রতারণার কার্যক্রম পরিচালনা করছে। সে উক্ত গ্রুপের চেয়ারম্যান বলে পরিচয় দেয়। এই চক্রের সাথে তার পরিবারের সদস্যরাও অতোপ্রতভাবে জড়িত। তন্মধ্যে স্ত্রী বকুলী ইয়াসমিন (৪৬), পূত্র মোঃ ইমরান রাজা (২৫) ও মোঃ রোমান বাদশা (১৮) এবং পূত্রবধূ মোছাঃ কাকুলী আক্তার (১৯) ভুয়া সংস্থাটির গুরুত্বপূর্র্ণ পদে রয়েছে বলে জানা যায়।

সাইফুল ইসলাম এর শিক্ষগত যোগ্যতা বিএসসি পাশ। সে প্রথমে টিউশনি ও পরবর্তীতে পোল্ট্রি ফিড ব্যবসা সাথে জড়িত ছিল। সে দীর্ঘ ১০/১১ বছর যাবত বিভিন্ন প্রতারণার সাথে জড়িত। তার নামে বিভিন্ন থানায় ০৫টি প্রতারণার মামলা রয়েছে। সে নিজেকে একজন আন্তর্জাতিক স্বনামধন্য বিজ্ঞানী হিসেবে পরিচয় দিয়ে ভিকটিমদের প্রলুব্ধ করত। সে উল্লেখ করত যে, বিদেশে তার বিভিন্ন আবিষ্কার ও গবেষণা ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে। এছাড়া তার প্রতিষ্ঠান জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব প্রতিকার ও জ্বালানীবিহীন জেনারেটর দ্বারা পরিচালিত পাওয়ার প্ল্যান্ট ও করোনা প্রতিরোধ ব্যবস্থার উদ্ভাবন ও বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে। সে ভিকটিমদের কাছে বিশ্বাস যোগ্যভাবে উপস্থাপন করত যে, করোনা প্রতিরোধে তার কয়েল টেকনিক পদ্ধতি বিশ্বব্যাপী করোনা প্রতিরোধে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে। সে আরও উল্লেখ করত, তার প্রজেক্ট সমূহের বাস্তবায়নে রাষ্ট্রীয় নীতিগত সিদ্ধান্ত প্রায় চুড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এ সংক্রান্তে বিভিন্ন ভূয়া পত্রালাপগুলো সে উপস্থাপন করত। তার সাথে বিদেশী বিজ্ঞানী, গবেষক ও নেতৃবৃন্দের যোগাযোগ রয়েছে বলে সে দাবী করত। যারা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে সম্মত রয়েছেন বলে মিথ্যা তথ্য উপস্থাপন করত। ভিকটিমদের বিশ্বাসযোগ্যাতা অর্জন করাতে সে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন, ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস, তুরস্ক প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়ের এরদোগান ছাড়াও সৌদি আরবের তৈল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এবং সাইপ্রাস ও জাপানসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এর নাম উদ্ধৃত করত। এছাড়াও ইরাকের এক আইনজীবি তার উদ্ভাবিত প্রজেক্টে এক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে ইচ্ছা পোষণ করেছে। এভাবে সে মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন তথ্য উপস্থাপন করে প্রতারিত করত।

প্রতারক সংগঠনের মূল কার্যালয় উত্তরায় অবস্থিত (নবস্থাপিত)। এছাড়া টাঙ্গাইলের বেপারী পাড়ায় একটি শাখা রয়েছে। অফিসের ১৫ জন সহযোগী কর্মরত; এছাড়া মাঠ পর্যায়ে আরও ৩০ জনের অধিক নিয়োগপ্রাপ্ত রয়েছে। মাঠ পর্যায়ের এজেন্টরা প্রাথমিক আলোচনা করে টার্গেট নির্ধারণ করত। অতঃপর গ্রুপ/কোম্পানী চেয়ারম্যান সাইফুলের সাথে সাক্ষাত করাত। পরবর্তীতে গ্রেফতারকৃত সাইফুল ভিকটিমদের বিভিন্ন প্রতারণার ফাঁদে ফেলত।

ভিকটিমদেরকে মূলত সাইফুল জলবায়ু পরিবর্তন প্রজেক্ট, বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট স্থাপন, পরিবেশ বান্ধব যানবাহন, ডায়াবেটিক নিরাময় প্রতিষেধক, হৃদরোগ নিরাময় প্রতিষেধক প্রজেক্ট, করোনা নিরাময় কয়েল টেকনিক প্রজেক্টে বিনিয়োগে প্রলুদ্ধ করত। প্রজেক্টসমূহের অর্থ বিনিয়োগে ২৫ হাজার হলে কোটি টাকার অফার এবং জমি প্রদানে প্রজেক্টের মালিকানা শেয়ার অফার দিত। স্বল্প শিক্ষিত ধনী ব্যবসায়ী ও জমিজমা সম্পত্তির মালিকদের সে টার্গেট করত।

ইতিমধ্যে উপকূলীয় অঞ্চল জলবায়ু পরিবর্তনের প্রজেক্ট এর আওতায় নোয়াখালীতে প্রায় ৪৫০ বিঘা জমি ছাড়াও লক্ষীপুর, রাজশাহী এবং ময়মনসিংয়ের ভালুকায় আরোও সহস্রাধিক বিঘা জমি প্রতারণার মাধ্যমে আত্মসাৎ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এছাড়া পাহাড়ি এলাকায়ও জমি জালিয়াতি কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন বলে সে জানায়। প্রায় কয়েক শতাধিক ভিকটিম তার দ্বারা প্রতারিত হয়েছে বলে ধারণা করা যায়।

আটককৃতরা হলেন:
১) মোঃ সাইফুল ইসলাম  (৫৪), পিতা-মৃত মৌলভী শামছুল হক, জেলা-টাঙ্গাইল, ২) মোছাঃ বকুলি ইয়াসমিন (৪৬), স্বামী-মোঃ সাইফুল ইসলাম, জেলা-টাঙ্গাইল, ৩) মোঃ ইমরান রাজা (২৫), পিতা- মোঃ সাইফুল ইসলাম, জেলা-টাঙ্গাইল, ৪) মোছাঃ কাকুলী আক্তার (১৯),স্বামী-মোঃ ইমরান রাজা, জেলা-টাঙ্গাইল, ৫) মোঃ রোমান বাদশা (১৮), পিতা-মোঃ সাইফুল ইসলাম, জেলা-টাঙ্গাইল, ৬) মোঃ আনিসুজ্জামান সিদ্দীকী (৫৩), পিতা-মৃত এমএ বাকী সিদ্দীকী, জেলা-টাঙ্গাইল, ৭) মোঃ নাজমুল হক (৩০), পিতা-মোঃ জিন্নত আলী, জেলা-টাঙ্গাইল, ৮) মোঃ তারেক আজিজ (৪০), পিতা-মৃত লোকমান মোল্লা, জেলা-গোপালগঞ্জ, ৯) মোঃ বেল্লাল হোসেন (৬১), পিতা-মৃত মোজাহার হোসেন মুন্সী, জেলা- গোপালগঞ্জ, ১০) মোঃ আব্দুল মান্নান (৫০), পিতা, মৃত জসমতুল্লা মন্ডল, জেলা- নওগাঁ, ১১) মোঃ শিমুল মিয়া (২৪), পিতা-মোঃ ইয়াকুব আলী, জেলা-টাঙ্গাইল, ১২) মোঃ নুরনবী (৪৫), পিতা-মৃত আনোয়ার হোসেন, জেলা-টাঙ্গাইল, ১৩) মোঃ আবুল হাশেম (৪২), পিতা-মৃত হানিফ, জেলা-টাঙ্গাইল, ১৪) মোঃ আলী হোসেন (৩৮), পিতা-মোঃ নুরুল ইসলাম, জেলা-টাঙ্গাইল, ১৫) মোঃ শওকত আলী (৫০), পিতা-মৃত শাহজাহান আলী, জেলা-টাঙ্গাইল এবং ১৬) মোঃ রোকনুজ্জামান (৫০), পিতা-মোঃ আব্দুল সালাম, জেলা- সিরাজগঞ্জ’দেরকে গ্রেফতার করে।

আটককৃতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন বলে জানিয়েছে র‍্যাব।

বাংলাটিভি/ র‍্যাব

সংশ্লিষ্ট খবর

Back to top button