গ্রাম বাংলাদেশবাংলা

৪৮ বছর পর বিনা টিকিটে ট্রেনভ্রমণের টাকা পরিশোধ

গাজীপুর প্রতিনিধি: ১৯৭৮ সালের দিকে ব্যবসায়িক ও ব্যক্তিগত কাজে বহুবার ট্রেনে ভ্রমণ করতেন মো. মফিজুল ইসলাম (৬০)। যেতেন বিনা টিকিটে, ফিরতেনও বিনা টিকিটে। প্রায় অর্ধশতাব্দী পর তার অনুশোচনা শুরু হয় বিনা টিকিটে ভ্রমণ নিয়ে। তিনি বিনা টিকিটে ভ্রমণ করার সেই টাকা পরিশোধ করতে চান, খুঁজছিলেন উপায়।

অবশেষে গত বুধবার গাজীপুরের শ্রীপুর রেলওয়ে স্টেশনমাস্টারের কাছে সেই রেলভ্রমণের ২০ হাজার টাকা পরিশোধ করে দীর্ঘদিনের অনুশোচনা ঘোচালেন।

মো. মফিজুল ইসলাম গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার চন্নাপাড়া গ্রামের মো. আব্দুল মান্নান ব্যাপারীর ছেলে। বর্তমানে তিনি ব্যাপারীবাড়ী ফাতেমাতুজ যাহরা (রা.) মহিলা মাদ্রাসা নামে প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করে পরিচালনা করছেন।

দীর্ঘদিন ধরে তাকে বিষয়টি পীড়া দিচ্ছিল। এখন রেলের টাকা পরিশোধ করে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলছেন তিনি।

মফিজুল ইসলাম জানান, ১৯৭৬ সালের দিকে তিনি জীবিকার তাগিদে ব্যবসা শুরু করেন। যোগাযোগব্যবস্থা ভালো না থাকায় শ্রীপুরে উৎপাদিত কাঁঠাল ট্রেনের ছাদে পরিবহন করে নিয়ে তিনি ঢাকায় বিক্রি করতেন। ঢাকায় যাতায়াতের জন্য তিনি কোনো টিকিট না কেটে দায়িত্বরতদের ১ টাকা দিয়ে দিতেন। এভাবেই বছর কয়েক নিয়মিত যাতায়াত করেছেন। সেই টাকা তো সরকারের কোষাগারে জমা হতো না। অর্ধশতাব্দী পর মফিজুল ইসলাম এমন চিন্তা থেকে অনুভব করেন, সেই সময় দেওয়া ১ টাকা দায়িত্বরতদের পকেটে গেলেও রেলওয়ে তাদের পাওনা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

তিনি বলেন, দুই থেকে তিন বছর টিকিট ছাড়াই যাতায়াত করেছি। দায়িত্বরতদের হাতে টাকা দিয়েছি ঠিকই, কিন্তু রেল কর্তৃপক্ষ তো আমার কাছে টাকা পায়নি। অনেক দিন ধরেই মনে হচ্ছিল, এই টাকাটা আমার পরিশোধ করা দরকার। বিবেকের কাছে আমি দায়বদ্ধ ছিলাম।

কিন্তু কত টাকা পরিশোধ করবেন, বুঝে উঠতে পারছিলেন না। তিনি নিজে নিজেই হিসেব কষে ২০ হাজার টাকার কম হবে বলে ধারণা করেন। সবশেষ তিনি ২০ হাজার টাকা পরিশোধ করেছেন।

এমন দায়বদ্ধতা থেকেই তিনি ছুটে যান শ্রীপুর রেলওয়ে স্টেশনে। স্টেশনমাস্টারকে অনুরোধ করেন তাকে ২০ হাজার টাকার টিকিট দেওয়ার জন্য। তবে একসঙ্গে এত টাকার টিকিট না থাকায় বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়। এক সপ্তাহ অপেক্ষার পর মফিজুল ইসলাম আবারও শ্রীপুর রেলওয়ে স্টেশনে যান। অবশেষে গত ১ এপ্রিল রেলওয়ের বিশেষ রসিদের (মানি রিসিপ্ট) মাধ্যমে তিনি ২০ হাজার টাকা জমা দিয়ে দায়মুক্ত হন।

শ্রীপুর রেলওয়ে স্টেশনমাস্টার মো. সাইদুর রহমান ২০ হাজার টাকা পরিশোধের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, গত ১ এপ্রিল মফিজুল ইসলাম স্টেশনে এসে টাকা পরিশোধ করেন। তা ৬ এপ্রিল রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়া হয়। রেলওয়েতে এভাবে পুরোনো বকেয়া বা দায়মুক্তির টাকা পরিশোধের আইনি বিধান রয়েছে। মফিজুল সাহেব এসে যখন বিষয়টি খুলে বললেন, আমরা তার মানসিকতায় মুগ্ধ হয়েছি। মানুষের সব সময় একরকম বোধোদয় থাকে না। জীবনের একপর্যায়ে যখন তিনি নিজের ভুল বুঝতে পেরেছেন এবং দায়মুক্ত হতে চেয়েছেন, তা অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে।

তিনি আরও বলেন, যে সকল মানুষ বিনা টিকিটে ভ্রমণ করেন তাদের জন্য মফিজ সাহেবের এ কাজটি বড় একটি বার্তা। কেউ যদি এমন অনুশোচনা থেকে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে টাকা জমা দিতে চান, তাহলে যেকোনো রেলস্টেশনে গিয়ে জমা দিতে পারবেন বলেও তিনি জানান।

সংশ্লিষ্ট খবর

Back to top button