বাংলাদেশ

‘আমি না খাইয়া থাকলেও কারো কাছে হাত পাতি না, শরম করে’

বাংলা টিভি ডেস্ক: সকাল পেরিয়ে যখন দুপুর ঘনিয়ে আসে, তখনও কাজ থামে না আনোয়ারা বেগম-এর। নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ-এর পাইনাদী এলাকায় একটি ভবনের পাশে বসে ছোট্ট হাতুড়ি দিয়ে ইট ভাঙতে দেখা যায় তাকে। বয়স প্রায় ৭০ ছুঁইছুঁই, শরীর দুর্বল, তবু থেমে থাকার উপায় নেই—কারণ কাজ বন্ধ মানেই বন্ধ হয়ে যাবে খাবার আর ওষুধের ব্যবস্থা।

আনোয়ারা বেগমের বাড়ি ডিমলা উপজেলা-র পূর্ব ছাতনাই গ্রামে। জীবনের শুরু থেকেই সংগ্রাম তার সঙ্গী। তিস্তা নদীর ভাঙনে হারিয়েছেন সবকিছু। পরে স্বামীকে নিয়ে ঢাকায় এসে নতুন করে জীবন শুরু করেন। কিন্তু ২০০৮ সালে স্বামী গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে সংসারের হাল ধরতে বাধ্য হন তিনি। তখন থেকেই শুরু ইট ভাঙার কাজ।

স্বামীর চিকিৎসা চালাতে গিয়ে শেষ হয়ে যায় সব সঞ্চয়। চার বছর অসুস্থ থাকার পর ২০১২ সালে মারা যান তিনি। এর আগেই সন্তানদের হারানোর বেদনাও সইতে হয়েছে আনোয়ারাকে—কেউ জন্মের আগেই, কেউ জন্মের কিছুদিন পরই মারা যায়। ফলে বার্ধক্যে এসে তিনি একেবারেই নিঃসঙ্গ।

এখন প্রতিদিন অল্প অল্প করে ইট ভেঙে যা আয় হয়, তা দিয়েই চলে তার জীবন। দিনে প্রায় ১৫০ টাকার মতো উপার্জন করেন, যা দিয়ে খাবার আর ওষুধ কিনতে হয়। অথচ আলসারসহ নানা রোগে ভুগছেন তিনি, নিয়মিত ওষুধ কিনতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয়।

সবচেয়ে বড় দুঃখ—এত কষ্টের পরও তিনি কোনো সরকারি সহায়তা পান না। জাতীয় পরিচয়পত্র না থাকায় বয়স্ক ভাতার মতো সুবিধা থেকেও বঞ্চিত। বহু বছর আগে ভোটার হওয়ার জন্য তথ্য দিলেও পরে আর কার্ড সংগ্রহ করতে পারেননি।

স্থানীয় বাসিন্দাদের সহায়তায় কোনোভাবে মাথা গোঁজার ঠাঁই পেয়েছেন তিনি। তবু নিজের সম্মানবোধ থেকে কারো কাছে হাত পাততে চান না। তার সরল কথা—“কাম করলে টাকা পামু, টাকা পাইলে খাওন আর ওষুধ পামু।”

এই গল্প শুধু একজন মানুষের নয়; এটি সমাজের এক কঠিন বাস্তবতা—যেখানে আজীবন পরিশ্রম করেও বার্ধক্যে নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না।

সংশ্লিষ্ট খবর

Back to top button