বাংলাদেশ

‘আমরা মানুষকে আনন্দ দেই, কিন্তু আমাদের জীবনে কোনো আনন্দ নেই’

বাংলা টিভি ডেস্ক: গাইবান্ধার এক দম্পতি মমিরুল ও পারুল—জীবন কাটাচ্ছেন সার্কাসের মঞ্চে মানুষকে হাসিয়ে, কিন্তু নিজেদের জীবনে নেই সেই আনন্দের প্রতিফলন। দিনের শুরু থেকে গভীর রাত পর্যন্ত, কখনো টানা ১৮ ঘণ্টা কাজ করেও তাদের দৈনিক আয় মাত্র এক হাজার থেকে ১২০০ টাকা। এই সামান্য অর্থেই চালাতে হয় খাওয়া, থাকা ও যাতায়াতসহ সব খরচ।

গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা-র নাকাইহাট ইউনিয়নের ছোট বাজনাপাড়া গ্রামে মমিরুলের বাড়ি। ছোটবেলা থেকেই আর্থিক ও সামাজিক সীমাবদ্ধতার কারণে তার পড়াশোনা বেশিদূর এগোয়নি। মাত্র ১৪ বছর বয়সেই তিনি সার্কাসে যোগ দেন। পরে বগুড়ার একটি সার্কাসে কাজ করতে গিয়ে পরিচয় হয় দিনাজপুরের ফুলবাড়ীর পারুল খাতুনের সঙ্গে। তিন বছরের সম্পর্কের পর তারা বিয়ে করেন। তাদের আড়াই বছরের মেয়ে ফাতেমাও বাবা-মায়ের মতোই ভিন্ন শারীরিক গঠনের।

দাম্পত্য জীবনে সুখ থাকলেও পেশাগত জীবনে হতাশা স্পষ্ট। মমিরুলের কথায়, তারা মানুষকে আনন্দ দিলেও নিজেরা সেই আনন্দ থেকে বঞ্চিত। সমাজ তাদের শ্রমিক নাকি শিল্পী—এই পরিচয়টুকুও স্পষ্ট নয়।

সার্কাসে কাজ করা অনেকেই একই বাস্তবতায় আটকে আছেন। নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা নেই, নেই স্বাস্থ্য সুরক্ষা বা সামাজিক নিরাপত্তা। পারিশ্রমিক নির্ধারণ করেন মালিক বা আয়োজকেরা, শ্রমিকদের মতামতের তেমন গুরুত্ব থাকে না। অনেক সময় দিনে ৬০০ টাকাও হাতে আসে না, যা দিয়ে জীবনযাপন প্রায় অসম্ভব।

পারুল খাতুন জানান, তারা চান না তাদের মেয়ে এই পেশায় আসুক। কারণ এখানে মানুষ বিনোদন নেয়, ছবি তোলে, কিন্তু সম্মান বা মূল্যায়ন দেয় না। বছরের নির্দিষ্ট সময়ে—বিশেষ করে রমজান ও বর্ষায়—কাজ বন্ধ থাকায় তাদের আরও কষ্টে দিন কাটে।

এই পেশার অনিশ্চয়তা থেকে অনেকেই বেরিয়ে যাচ্ছেন। যেমন, সাঘাটা উপজেলা-র জেবেদা বেগম একসময় সার্কাসে কাজ করলেও এখন ঝালমুড়ি বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। তার মতে, যে পেশায় সম্মান ও নিরাপত্তা নেই, সেখানে টিকে থাকা কঠিন।

একই অভিজ্ঞতা রয়েছে আরও অনেকের। বিয়ের পর বা পারিবারিক কারণে তারা সার্কাস ছেড়ে দিয়েছেন। অনেকেই বলেন, এই পেশায় দীর্ঘ সময় শ্রম দিলেও নেই কোনো ভবিষ্যৎ নিশ্চয়তা বা সরকারি সহায়তা। প্রতিবন্ধী ভাতা ছাড়া তেমন কোনো সহায়তা তারা পান না।

সামাজিকভাবেও তারা নানা বৈষম্যের শিকার। শৈশব থেকেই কটু কথা, উপহাস ও অবহেলার কারণে অনেকেই শিক্ষাজীবন থেকে ঝরে পড়েন। ফলে বিকল্প পেশায় যাওয়ার সুযোগও সীমিত হয়ে যায়।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সার্কাস কর্মীরা দেশের বিনোদন জগতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও তারা এখনও প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি পাননি। পহেলা মে-তে যখন শ্রমিক অধিকারের কথা বলা হয়, তখন এই গোষ্ঠীটি থেকে যায় আলোচনার বাইরে।

গাইবান্ধার সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা বলছেন, সার্কাসকে টিকিয়ে রাখতে হলে এই কর্মীদের “শিল্পী” হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। তাদের জন্য ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। নইলে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাবে দেশের ঐতিহ্যবাহী সার্কাস সংস্কৃতি।

সংশ্লিষ্ট খবর

Back to top button