২৪ বছরে ১১২ এতিম মেয়ের বিয়ে দিলেন রুবেল

বাংলা টিভি ডেস্ক: বাবাকে হারিয়েছেন প্রায় এক দশক আগে। এরপর অন্যের বাড়িতে কাজ করে মেয়েকে বড় করেছেন মা জহুরা খাতুন। অভাবের সংসারে অনেক কষ্টে মেয়েকে মানুষ করলেও বিয়ের বয়সে এসে নতুন দুশ্চিন্তায় পড়েন তিনি। আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় মেয়ের বিয়ের আয়োজন নিয়ে যখন চিন্তায় ছিলেন, তখনই পাশে দাঁড়ান নাটোরের বড়াইগ্রামের রুহুল আমিন রুবেল।
শুধু বিয়ের খরচ বহন নয়, নিজের মেয়ের মতো করে ধুমধাম আয়োজন করে বিয়ে দিয়েছেন তিনি। বরযাত্রীদের আপ্যায়ন থেকে শুরু করে খাবারের আয়োজন—কোনো কিছুতেই কমতি রাখেননি। এভাবেই গত ২৪ বছরে ১১২ জন অসহায়, হতদরিদ্র ও এতিম মেয়ের বিয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন রুবেল।
শনিবার (২২ আগস্ট) রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার বালাদিয়া গ্রামের ১৯ বছর বয়সী সুমাইয়া আক্তার তিথির বিয়ের আয়োজনও করেন তিনি।
বিয়েকে ঘিরে সকাল থেকেই তিথিদের বাড়িতে ছিল উৎসবের আমেজ। বাড়ির সামনে সাজানো হয় বিয়ের গেট। অতিথি ও বরযাত্রীদের জন্য চেয়ার-টেবিলের ব্যবস্থা করা হয়। পাশাপাশি গরু, খাসি, মুরগি, ডিম, পোলাওসহ নানা ধরনের খাবার রান্নার আয়োজন চলে।
বাড়ির একটি জরাজীর্ণ কক্ষে তখন বউ সাজানো হচ্ছিল তিথিকে। একদিকে উৎসবের ব্যস্ততা, অন্যদিকে কনের সাজ—সব মিলিয়ে পুরো বাড়িতে তৈরি হয় আনন্দঘন পরিবেশ।
প্রায় ১০ বছর আগে বাবাকে হারান তিথি। এরপর মা জহুরা খাতুনই হয়ে ওঠেন তার একমাত্র অবলম্বন। অন্যের বাড়িতে কাজ করে মেয়ের পড়াশোনা ও সংসারের খরচ চালিয়েছেন তিনি। নানা সংকটের মধ্যেও মেয়েকে আগলে রেখেছেন।
তবে মেয়ের বিয়ের সময় সামর্থ্যের অভাব তাকে আরও দুশ্চিন্তায় ফেলে দেয়। একপর্যায়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রুহুল আমিন রুবেলের অসহায় মেয়েদের বিয়ে দেওয়ার উদ্যোগের কথা জানতে পারেন জহুরা খাতুন। পরে তার সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিথির পরিবারের পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজ নেন রুবেল এবং বিয়ের পুরো দায়িত্ব নেওয়ার সিদ্ধান্ত জানান।
শুক্রবার রাতে গায়ে হলুদের মধ্য দিয়ে শুরু হয় আয়োজন। শনিবার জুমার নামাজের পর বর তরিকুল ইসলাম ও তার বরযাত্রীরা কনের বাড়িতে আসেন। পাশের রাজশাহীর তালাইমারী এলাকার বাসিন্দা তরিকুলকে সোনার আংটি দিয়ে বরণ করেন রুবেল। এরপর সম্পন্ন হয় বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা।
তিথির মা জহুরা খাতুন বলেন, মেয়ের বিয়ে নিয়ে তিনি অনেক দুশ্চিন্তায় ছিলেন। রুবেলের সঙ্গে যোগাযোগের পর তিনি পুরো দায়িত্ব নেন এবং নিজের মেয়ের মতো করে বিয়ের আয়োজন করেন। এমন আয়োজন তাদের পরিবারের কাছে ছিল কল্পনারও বাইরে।
নববধূ তিথি বলেন, বাবা না থাকলেও বিয়ের দিনে তার অভাব খুব একটা অনুভব করেননি। এত বড় আয়োজন দেখে তিনি নিজেই অবাক হয়েছেন।
বর তরিকুল ইসলামও কনে পক্ষের আতিথেয়তা ও আয়োজনের প্রশংসা করেন। নবদম্পতি তাদের নতুন জীবনের জন্য সবার কাছে দোয়া চেয়েছেন।
স্থানীয় ইমাম ও বাসিন্দারাও রুবেলের উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন। তাদের মতে, বছরের পর বছর অসহায় ও এতিম মেয়েদের বিয়ের দায়িত্ব নেওয়া নিঃসন্দেহে একটি মহৎ কাজ। সমাজের সামর্থ্যবান মানুষরা এ ধরনের কাজে এগিয়ে এলে আরও অনেক অসহায় পরিবারের মুখে হাসি ফুটবে।
রুহুল আমিন রুবেল বলেন, কোনো প্রচারের উদ্দেশ্যে নয়, পরকালের কথা চিন্তা করেই তিনি গত ২৪ বছর ধরে অসহায়, দরিদ্র ও এতিম মেয়েদের বিয়ের দায়িত্ব পালন করছেন। এটি তার ১১২তম বিয়ে। দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে কেউ যোগাযোগ করলে তিনি খোঁজখবর নেন। সত্যিই অসহায় হলে নিজের অর্থে বিয়ের প্রয়োজনীয় খরচ বহন করেন।
পেশায় ব্যবসায়ী রুবেলের কাছে মানুষের পাশে দাঁড়ানো শুধু দায়িত্ব নয়, সৌভাগ্যেরও বিষয়।
তিথির জীবনে বাবার শূন্যতা হয়তো কখনো পূরণ হওয়ার নয়। তবে বিয়ের দিনে রুবেল বাবার মতো পাশে দাঁড়িয়ে তাকে বুঝিয়ে দিয়েছেন—রক্তের সম্পর্কের বাইরেও মানবিকতা, ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ থেকে তৈরি হতে পারে গভীর এক সম্পর্ক।
রুবেলের ১১২টি বিয়ে তাই শুধু একটি সংখ্যা নয়; এটি ১১২টি পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর গল্প। বছরের পর বছর নিজের সামর্থ্য দিয়ে অন্যের জীবনে আনন্দের আলো জ্বালিয়ে চলেছেন তিনি।



