বাবার প্যারালাইসিসে থেমে গেল পড়াশোনা, ২০০ টাকার আয়ে চলছে সংসার

সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি( ডিজিটাল): খাবার খাওয়ার সময় হঠাৎ ডান হাত অবশ হয়ে যায় সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ উপজেলার মেঘাই ভদ্রঘাঁট গ্রামের আব্দুল মান্নানের। হাসপাতালে নেওয়ার আগেই ধীরে ধীরে তাঁর শরীরের অন্যান্য অংশও অবশ হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হয়ে অচল হয়ে যান তিনি। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি অসুস্থ হয়ে পড়ায় এখন চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে তাঁর পরিবারটির।
আব্দুল মান্নান আগে গ্রামে মাটি কাটার কাজ করতেন। পরে স্ত্রী রাশেদা বেগম ও ছেলে রাকিবুল ইসলামকে নিয়ে ঢাকায় চলে যান। সেখানে তিনি দিনমজুরের কাজ করতেন এবং তাঁর স্ত্রী একটি গার্মেন্টসে চাকরি করতেন। তাঁদের ছেলে রাকিবুল সাভারের একটি কওমি মাদ্রাসায় পড়াশোনা করত।
হঠাৎ মান্নান অসুস্থ হয়ে পড়ায় পরিবারের সব হিসাব-নিকাশ বদলে যায়। বাবার চিকিৎসা ও সংসারের খরচ চালাতে পড়াশোনা বন্ধ করে কাজে নেমে পড়ে রাকিবুল। মাকে সে বলে, বাবাকে নিয়ে গ্রামের বাড়িতে ফিরে যেতে এবং তাকে কোনো একটি দোকানে কাজে দিতে। নিজের উপার্জন দিয়ে বাবার চিকিৎসায় সহযোগিতা করতে চায় সে।
এরপর ঢাকার চাকরি ছেড়ে স্বামীর সঙ্গে গ্রামের বাড়িতে ফিরে আসেন রাশেদা বেগম। ছেলেকে ভদ্রঘাঁট বাজারের একটি মিষ্টির দোকানে কাজে দেন। সেখানে প্রতিদিন ২০০ থেকে ২৫০ টাকা আয় করে রাকিবুল। কিন্তু এই সামান্য আয়ে সংসার ও বাবার চিকিৎসার খরচ চালানো সম্ভব না হওয়ায় রাশেদাকেও আবার কাজে যোগ দিতে হয়। স্থানীয় সোনার মদিনা কটন মিলে কাজ করে মাসে মাত্র পাঁচ হাজার টাকা পান তিনি।
রাশেদা বেগম জানান, স্বামীর এখন অন্যের সাহায্য ছাড়া কোনো কাজই সম্ভব নয়। তাকে বসানো, গোসল করানো, খাওয়ানো থেকে শুরু করে শৌচাগারে নেওয়া—সবকিছুই করতে হয়। একদিকে সংসারের জন্য কাজ করতে হয়, অন্যদিকে স্বামীর দেখাশোনাও করতে হয়। অর্থের অভাবে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা করাতে না পারায় অসহায় হয়ে পড়েছেন তিনি।
তিনি বলেন, পর্যাপ্ত অর্থ থাকলে স্বামীকে ভালো চিকিৎসা করাতে পারতেন। চিকিৎসার পর যদি তিনি সামান্য হলেও হাঁটাচলা করতে পারতেন, সেটিই তাঁদের জন্য সবচেয়ে বড় স্বস্তির বিষয় হতো।
অর্থের অভাবে নিয়মিত চিকিৎসা করাতে না পেরে বর্তমানে সামর্থ্য অনুযায়ী স্থানীয় চিকিৎসা ও ঝাড়ফুঁকের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে পরিবারটিকে। ছেলের সামান্য আয় থেকেও বাবার চিকিৎসার খরচ দিতে হচ্ছে।
বাবার অসুস্থতার কারণে নিজের পড়াশোনা থেমে যাওয়ার কথা জানিয়ে রাকিবুল ইসলাম বলেন, তিনি সাভারের একটি মাদ্রাসায় পড়তেন এবং কোরআনের ১৩ পারা মুখস্থ করেছেন। কিন্তু বাবার অসুস্থতার পর পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। এখন একটি হোটেলে কাজ করে প্রতিদিন ২০০ থেকে ২৫০ টাকা আয় করেন এবং সেই টাকা দিয়ে বাবার চিকিৎসায় সহযোগিতা করার চেষ্টা করেন।
প্রতিবেশীরা জানান, একসময় আব্দুল মান্নান নিজেই কাজ করে পরিবারের খরচ চালাতেন। এখন প্যারালাইসিসে অচল হয়ে পড়ায় স্ত্রী ও ছেলের সামান্য আয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে গেছে। পরিবারের কোনো সহায়-সম্পত্তিও নেই। স্থানীয়রা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতা করলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।
বর্তমানে একদিকে বিছানায় অচল বাবা, অন্যদিকে বাবার চিকিৎসার খরচ জোগাতে পড়াশোনা ছেড়ে কাজে নামা ছেলে। সংসারের হাল ধরতে মা মাত্র পাঁচ হাজার টাকা বেতনে কাজ করছেন। অর্থের অভাবে উন্নত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত এই পরিবারটি এখন সহায়তার অপেক্ষায় রয়েছে।
কামারখন্দ উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. আব্দুল মোতালিব বলেন, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে কোনো খরচ হয় না। ওষুধ কেনার সামর্থ্য না থাকলে সমাজসেবা কার্যালয় থেকে ওষুধ কেনার জন্য সহায়তা করা যেতে পারে। পাশাপাশি অনলাইনে আর্থিক সহায়তার জন্য আবেদন করলে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করার কথাও জানান তিনি।



