ধর্ম

যেখানে রিজিকের দায়িত্ব নিয়েছেন স্বয়ং আল্লাহ, তবু এত দুশ্চিন্তা কিসের?

বাংলা টিভি ডেস্ক: রিজিক মানুষের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। খাবার, অর্থ-সম্পদ, জীবিকা, স্বাস্থ্য, সন্তান, জ্ঞান, সময় ও মানসিক শান্তি—সবই আল্লাহর পক্ষ থেকে পাওয়া নিয়ামত। কিন্তু জীবিকা নিয়ে অনিশ্চয়তা ও ভবিষ্যতের চিন্তায় অনেকেই দুশ্চিন্তায় ভুগে থাকেন। ইসলামের শিক্ষা হলো, হালাল পথে চেষ্টা করার পাশাপাশি রিজিকের ব্যাপারে আল্লাহর ওপর আস্থা রাখা।

রিজিকের জন্য চেষ্টা করতে হবে

ইসলাম মানুষকে কর্মবিমুখ হতে বলে না। বরং হালাল উপায়ে জীবিকা অনুসন্ধানের নির্দেশ দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন—

“নামাজ শেষ হলে তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ো এবং আল্লাহর অনুগ্রহ অনুসন্ধান করো। আর আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করো, যাতে তোমরা সফল হতে পারো।”
—সুরা আল-জুমুআহ, আয়াত: ১০

অর্থাৎ একজন মুমিনের দায়িত্ব হলো নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী পরিশ্রম করা এবং জীবিকা অর্জনের ক্ষেত্রে বৈধ পথ বেছে নেওয়া।

প্রতিটি প্রাণীর রিজিক আল্লাহর দায়িত্বে

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন—

“পৃথিবীতে বিচরণকারী এমন কোনো প্রাণী নেই, যার রিজিকের দায়িত্ব আল্লাহর ওপর নেই।”
—সুরা হুদ, আয়াত: ৬

এই আয়াত মুমিনের মনে আশ্বস্ত হওয়ার শিক্ষা দেয়। পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণীর জীবিকা সম্পর্কে আল্লাহ অবগত। তাই ভবিষ্যৎ নিয়ে অতিরিক্ত ভয় না করে তাঁর ওপর বিশ্বাস রাখা উচিত।

রিজিকের প্রকৃত মালিক আল্লাহ

মানুষ চাকরি, ব্যবসা, কৃষিকাজ কিংবা অন্য কোনো পেশার মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করে। তবে ইসলামের দৃষ্টিতে এসব মাধ্যম মাত্র; প্রকৃত রিজিকদাতা আল্লাহ।

আল্লাহ বলেন—

“নিশ্চয়ই আল্লাহই একমাত্র রিজিকদাতা; তিনি শক্তির অধিকারী, পরাক্রমশালী।”
—সুরা আয-যারিয়াত, আয়াত: ৫৮

তাই কোনো একটি মাধ্যম বন্ধ হয়ে গেলে হতাশ হওয়ার কারণ নেই। একজন মুমিন বিশ্বাস করেন, আল্লাহ চাইলে অন্য পথেও রিজিকের ব্যবস্থা করতে পারেন।

কখনো রিজিক বাড়ে, কখনো কমে

অনেক সময় কঠোর পরিশ্রম করেও মানুষ প্রত্যাশা অনুযায়ী আয় করতে পারেন না। আবার কেউ তুলনামূলক কম প্রচেষ্টায় বেশি সম্পদ অর্জন করেন। ইসলাম এটিকে আল্লাহর হিকমত ও পরীক্ষার অংশ হিসেবে দেখতে শেখায়।

আল্লাহ তাআলা বলেন—

“নিশ্চয়ই তোমার প্রতিপালক যাকে ইচ্ছা রিজিক বাড়িয়ে দেন এবং যাকে ইচ্ছা সীমিত করে দেন।”
—সুরা বনি ইসরাঈল, আয়াত: ৩০

অভাব যেমন পরীক্ষা, তেমনি প্রাচুর্যও পরীক্ষা। তাই কম রিজিকে ধৈর্য এবং বেশি রিজিকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিত।

আল্লাহর ওপর ভরসা করলে তিনিই যথেষ্ট

রিজিকের ব্যাপারে অযথা দুশ্চিন্তা না করে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করার শিক্ষা দিয়েছে কোরআন।

“আর যে আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তার জন্য তিনিই যথেষ্ট।”
—সুরা আত-তালাক, আয়াত: ৩

তবে তাওয়াক্কুল মানে চেষ্টা ছেড়ে দেওয়া নয়। বরং নিজের দায়িত্ব অনুযায়ী চেষ্টা করে ফলাফলের ব্যাপারে আল্লাহর সিদ্ধান্তের ওপর সন্তুষ্ট থাকা।

রিজিক মানেই শুধু টাকা-পয়সা নয়

আমরা সাধারণত রিজিক বলতে অর্থ বা খাবারকেই বুঝি। কিন্তু ইসলামী দৃষ্টিতে রিজিকের পরিধি আরও বিস্তৃত। সুস্থতা, ঈমান, জ্ঞান, নেক সন্তান, ভালো পরিবার, মানসিক প্রশান্তি, সময় ও সম্মান—এসবও আল্লাহর মূল্যবান নিয়ামত।

কখনো মানুষের অর্থ কম থাকতে পারে, কিন্তু তার সুস্থতা, পরিবার ও মানসিক শান্তি হয়তো অন্য অনেকের চেয়ে বেশি। তাই রিজিকের হিসাব শুধু ব্যাংক ব্যালান্স দিয়ে করা যায় না।

নির্ধারিত রিজিক থেকে কেউ বঞ্চিত হবে না

হাদিসে রিজিকের বিষয়ে আশ্বস্ত করে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, মানুষ যেন আল্লাহকে ভয় করে এবং উত্তম পন্থায় জীবিকা অনুসন্ধান করে। কারণ কোনো ব্যক্তি তার নির্ধারিত রিজিক পূর্ণভাবে লাভ না করা পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করবে না।
—সুনানে ইবনে মাজাহ

এই শিক্ষা মানুষকে অলস হওয়ার নয়, বরং বৈধ পথে চেষ্টা করার এবং আল্লাহর ওপর আস্থা রাখার অনুপ্রেরণা দেয়।

সুতরাং রিজিক নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা না করে হালাল পথে পরিশ্রম করা, হারাম উপার্জন থেকে বেঁচে থাকা, আল্লাহর কাছে দোয়া করা এবং তাঁর সিদ্ধান্তের ওপর ভরসা রাখাই একজন মুমিনের জন্য উত্তম পথ। জীবিকার দরজা কখন কোথা থেকে খুলে যাবে, তা মানুষ জানে না—কিন্তু আল্লাহ সবকিছুই জানেন।

সংশ্লিষ্ট খবর

Back to top button