মক্কার ইমামের ভুল ধরেছিলেন যে বাংলাদেশি আলেম

বাংলা টিভি ডেস্ক: সিলেটের কানাইঘাটের আল্লামা মুশাহিদ আহমদ বায়ামপুরী (রহ.) ছিলেন উপমহাদেশের অন্যতম খ্যাতিমান আলেম ও হাদিসবিশারদ। গভীর জ্ঞান, অসাধারণ স্মৃতিশক্তি এবং দ্বীনি শিক্ষায় তার খ্যাতি দেশের সীমানা ছাড়িয়ে ভারতীয় উপমহাদেশের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছিল। ১৯৪৭ সালে হজ পালনের সময় মক্কার ইমামের খুতবায় ভুল ধরার ঘটনাটি তার জীবনের অন্যতম আলোচিত অধ্যায় হিসেবে বিভিন্ন জীবনীতে উল্লেখ করা হয়েছে।
শৈশব থেকেই জ্ঞানচর্চায়
১৯০৭ সালে সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার বায়ামপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আল্লামা মুশাহিদ আহমদ বায়ামপুরী (রহ.)। ছোট বয়সেই বাবাকে হারান তিনি। মায়ের কাছেই তার প্রাথমিক শিক্ষার হাতেখড়ি। মাত্র সাত বছর বয়সে কোরআন শিক্ষা সম্পন্ন করেন। পরে কানাইঘাট ইসলামিয়া মাদরাসায় পড়াশোনা শেষে উচ্চশিক্ষার জন্য ভারতে যান।
রামপুর আলিয়া মাদরাসা ও মিরাঠ আলিয়া মাদরাসায় প্রায় সাত বছর অধ্যয়ন করেন তিনি। হাদিস, তাফসির, ফিকহ, আকাইদ ও দর্শনসহ বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞান অর্জনের পর ১৯৩৬ সালে ভর্তি হন দারুল উলুম দেওবন্দে। জীবনীতে উল্লেখ রয়েছে, সেখানে হাদিসশাস্ত্রে সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জনের পাশাপাশি মেধাতালিকায়ও প্রথম স্থান অধিকার করেন তিনি।
হজে পাণ্ডিত্যের পরিচয়
আল্লামা বায়ামপুরী (রহ.) জীবনে তিনবার হজ পালন করেন। ১৯৪৭ সালের হজে তার জ্ঞান ও পাণ্ডিত্যের পরিচয় পেয়ে আরবের আলেমরা মুগ্ধ হয়েছিলেন বলে বিভিন্ন জীবনীতে দাবি করা হয়েছে।
ওই হজের সময় মক্কার ইমামের একটি খুতবায় ভুল তার নজরে আসে। বিষয়টি তিনি সংশোধনের জন্য তুলে ধরেন। তার হাদিসশাস্ত্রের জ্ঞান ও গভীর পাণ্ডিত্যে সে সময়ের সৌদি আলেমরা বিস্মিত হয়েছিলেন বলেও জীবনীগ্রন্থগুলোতে উল্লেখ পাওয়া যায়।
এমনকি তৎকালীন সৌদি বাদশাহ তার সামনে রাষ্ট্রীয় সংবিধান উপস্থাপন করে কোথাও ভুল বা সংশোধনের প্রয়োজন রয়েছে কি না, তা দেখতে বলেছিলেন—এমন দাবিও তার জীবনীতে পাওয়া যায়। পরে তিনি কয়েকটি বিষয়ে সংশোধনের পরামর্শ দিয়েছিলেন বলে উল্লেখ রয়েছে।
দারুল উলুম দেওবন্দের পড়াশোনা শেষ করে ভারতে শিক্ষকতা শুরু করেন আল্লামা বায়ামপুরী। পরে সিলেটবাসীর অনুরোধে দেশে ফিরে সিলেট সরকারি আলিয়া মাদরাসায় শায়খুল হাদিসের দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি গাছবাড়ী জামিউল উলুম কামিলা মাদরাসাতেও হাদিস পড়িয়েছেন তিনি।
১৯৫৩ সালে নিজ জন্মস্থান কানাইঘাটে ফিরে কানাইঘাট ইসলামিয়া মাদরাসায় যোগ দেন। পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠানটির নাম পরিবর্তন করে ‘দারুল উলুম কানাইঘাট’ রাখা হয়। ১৯৫৪ সালে সেখানে দাওরায়ে হাদিস চালু করেন তিনি। জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক ও শায়খুল হাদিস হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
তার পাঠদানের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়লে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শিক্ষার্থীরা কানাইঘাটে আসতে শুরু করেন। তার গড়ে তোলা প্রতিষ্ঠানটি পরবর্তীতে সিলেটের গুরুত্বপূর্ণ দ্বীনি শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
সমাজ সংস্কারেও ভূমিকা
শিক্ষকতা ও লেখালেখির পাশাপাশি মুসলিম সমাজের কুসংস্কার, অনাচার ও বিভিন্ন সামাজিক অসঙ্গতির বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন আল্লামা বায়ামপুরী (রহ.)। সিলেটের বিভিন্ন এলাকায় ওয়াজ ও নসিহতের মাধ্যমে মানুষকে সচেতন করতেন।
রমজান মাসে সিলেটের বন্দরবাজার জামে মসজিদে তারাবির পর থেকে সাহরি পর্যন্ত তার তাফসির ও আলোচনা শুনতে বিপুলসংখ্যক মানুষ সমবেত হতেন। ধর্মীয় জ্ঞানের পাশাপাশি তার আলোচনায় বিজ্ঞান, সমাজ ও সমকালীন বিভিন্ন বিষয়ও উঠে আসত।
রাজনীতিতেও সক্রিয় ছিলেন
আল্লামা বায়ামপুরী (রহ.) রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। তার শিক্ষক মাওলানা হোসাইন আহমদ মাদানী (রহ.)-এর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতিতে সক্রিয় হন।
১৯৬২ সালের নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অংশ নিয়ে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। পরে ১৯৬৫ ও ১৯৭০ সালের নির্বাচনেও অংশ নেন। সংসদে তিনি কোরআন-সুন্নাহভিত্তিক আইন প্রণয়ন, ইসলামি শিক্ষার প্রসার এবং পূর্ব পাকিস্তানে ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি তুলে ধরেন।
রেখে গেছেন গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ
আল্লামা বায়ামপুরী (রহ.) ছিলেন একজন লেখকও। রাজনীতি, তাসাউফ, ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থা ও ধর্মীয় বিভিন্ন বিষয়ে তিনি একাধিক বই লিখেছেন। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘ফাতহুল কারীম ফি সিয়াসাতিন্নাবিয়ীল আমীন’, ‘আল-ফুরকান বাইনাল হক্বে ওয়াল বাতিল ফি ইলমিত তাসাউফে ওয়াল ইহসান’, ‘সত্যের আলো’, ‘ইসলামে ভোট ও ভোটের অধিকার’ এবং ‘সেমাউল কোরআন’।
১৯৭১ সালে ইন্তেকাল
আল্লামা মুশাহিদ বায়ামপুরী (রহ.) ১৩৯০ হিজরির ১০ জিলহজ, ১৯৭১ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি ঈদুল আজহার রাতে ইন্তেকাল করেন। পরদিন ঈদের দিন আসরের পর তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে ইমামতি করেন তার ছোট ভাই আল্লামা মুজাম্মিল (রহ.)।
নিজ হাতে গড়ে তোলা দারুল উলুম কানাইঘাট মাদরাসার সামনেই তাকে দাফন করা হয়।
জ্ঞানচর্চা, হাদিস শিক্ষা, সমাজ সংস্কার, রাজনীতি ও দ্বীনি খেদমনে আল্লামা মুশাহিদ বায়ামপুরী (রহ.)-এর দীর্ঘ কর্মজীবন সিলেটের ধর্মীয় ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে আছে। তার প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও রচনাবলি আজও তার অবদানের স্মারক হিসেবে বিবেচিত।



