‘মন খারাপ করার অধিকারও নেই, কথা বললে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যাবে’

বাংলা টিভি ডেস্ক: মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, ক্রসফায়ারের হুমকি এবং রাজনৈতিক কর্মীদের মূল্যায়ন নিয়ে বিএনপি সরকারের সমালোচনা করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক ও সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ। তাঁর অভিযোগ, সরকারের সমালোচনা করলেই মামলা ও গ্রেপ্তারের ঝুঁকিতে পড়তে হচ্ছে নাগরিকদের।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) রাজধানীর জিরো পয়েন্টে আয়োজিত লিফলেট বিতরণ ও গণসংযোগ কর্মসূচিতে তিনি এসব কথা বলেন। আইনশৃঙ্খলার অবনতি, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বমূল্য এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণের প্রতিবাদে আগামী ৩০ অক্টোবরের বিক্ষোভ সমাবেশ সফল করার লক্ষ্যে এ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।
হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ‘এখন বক্তব্য কী দেব? বক্তব্য তো প্রত্যেক দিনই দিচ্ছি। এখন বক্তব্য দিলে মানুষ নিজের ওপর রাগ করলেও পুলিশ এসে ধরে নিয়ে যায়। মন খারাপ করার অধিকারও আপনার নেই।’
তিনি আরও অভিযোগ করেন, বর্তমান সরকারের সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা ও মতপ্রকাশের কারণে ৩০ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। তাঁর দাবি, নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থানের কথা বললেও এখন সরকারের সমালোচকদের বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটছে।
পুলিশের ভূমিকা এবং ক্রসফায়ার-সংক্রান্ত বক্তব্যের সমালোচনা করে এনসিপির এই নেতা বলেন, তাঁরা এমন একটি পুলিশ বাহিনী প্রত্যাশা করেছিলেন, যারা জনগণের সেবা করবে এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখবে। কিন্তু তাঁর মতে, অতীতের মতো বর্তমানেও পুলিশকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহারের অভিযোগ উঠছে।
আইজিপি আলী হোসেন ফকিরের বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, কোনো বিতর্কিত বক্তব্যের পর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে সরল বিশ্বাসে ভুল করা ব্যক্তি হিসেবে ব্যাখ্যা করার প্রবণতা গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি অভিযোগ করেন, পুলিশকে জবাবদিহির আওতায় আনার পরিবর্তে এ ধরনের ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে।
আইজিপির নিয়োগ ও রাজনৈতিক যোগাযোগ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তাঁর দাবি, পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যে রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে বিভাজন তৈরি হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য অনুষ্ঠানে তুলে ধরা হয়নি।
সরকার আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে ক্রসফায়ার-সংক্রান্ত অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের বিবৃতির সমালোচনা করে হাসনাত আবদুল্লাহ কনস্টেবল, এসআই ও জুনিয়র কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে থেকে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী কিছু কর্মকর্তা অধস্তন পুলিশ সদস্যদের ব্যবহার করে সুবিধা নিলেও সংকটের সময় মাঠপর্যায়ের সদস্যদেরই ঝুঁকির মুখে পড়তে হয়। এ সময় সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা বেনজীর আহমেদ ও হারুন অর রশীদের প্রসঙ্গও উল্লেখ করেন তিনি।
আইজিপি আলী হোসেন ফকিরের বিদেশে সম্পদ অর্জন নিয়ে অভিযোগের তদন্ত দাবি করে হাসনাত বলেন, তাঁর অস্ট্রেলিয়ায় বাড়ি কেনার বিষয়ে যে তথ্য শোনা যাচ্ছে, তা খতিয়ে দেখা উচিত। তবে এ অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ তিনি বক্তব্যে উপস্থাপন করেছেন কি না, তা উল্লেখ করা হয়নি।
রাজনৈতিক কর্মীদের অবদান যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন এনসিপির এই নেতা। তাঁর ভাষ্য, আন্দোলন-সংগ্রামে অংশ নেওয়া তৃণমূলের কর্মীরা নানা ঝুঁকি ও ত্যাগ স্বীকার করলেও সংকট কেটে যাওয়ার পর তাঁদের প্রত্যাশা পূরণ হয় না।
এ প্রসঙ্গে তিনি ছাত্রদল নেতা শাকিল ইসলামের হত্যাকাণ্ডের কথা উল্লেখ করেন। হাসনাত বলেন, দীর্ঘদিন রাজনৈতিক নিপীড়ন ও হামলা-মামলার শিকার হওয়া কর্মীদের জীবনের মূল্য অর্থ দিয়ে নির্ধারণ করা যায় না। তিনি অভিযোগ করেন, একজন সংসদ সদস্যের ছেলে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠলে তার বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তা জনগণের সামনে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, শাকিল হত্যার ঘটনায় বিচারপ্রক্রিয়ার অগ্রগতি এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে।
ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংগ্রামের কথা তুলে ধরে হাসনাত আবদুল্লাহ অভিযোগ করেন, তৃণমূলের কর্মীরা বিভিন্ন সময়ে হামলা, মামলা ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে থাকলেও ক্ষমতার পরিবর্তনের পর তাঁদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হচ্ছে না।
তাঁর দাবি, রাজনৈতিক নেতাদের অনেকেই নিজেদের পরিবারের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করলেও মাঠপর্যায়ের কর্মীদের ঝুঁকি নিতে হয়। অথচ পরবর্তী সময়ে নেতৃত্ব ও সুযোগ-সুবিধা বণ্টনের ক্ষেত্রে কর্মীদের অবদান উপেক্ষিত থাকে।
বক্তব্যের শেষাংশে তিনি রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছে কর্মীদের ত্যাগের যথাযথ মূল্যায়ন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জবাবদিহি এবং নাগরিকদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার দাবি জানান।



