বাংলাদেশ

দুই বছরেও থামেনি কান্না, বিচারের আশায় চট্টগ্রামের প্রথম তিন শহীদ পরিবার

বাংলা টিভি ডেস্ক: আজ ১৬ জুলাই। দুই বছর আগে এই দিনেই চট্টগ্রাম নগরের মুরাদপুর এলাকায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ঘিরে সংঘটিত সহিংসতায় প্রথম প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। সেদিনের সংঘর্ষে প্রাণ হারান তিন তরুণ—চট্টগ্রাম সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী মো. ওয়াসিম আকরাম, ওমরগণি এমইএস কলেজের শিক্ষার্থী ফয়সাল আহমেদ শান্ত এবং কর্মজীবী তরুণ মো. ফারুক।

একই দিনে রংপুরে আবু সাঈদের মৃত্যুর ঘটনাও আন্দোলনকে নতুন মাত্রা দেয়। দুই বছর পরও নিহতদের পরিবারের কাছে সেই দিনটির স্মৃতি যেন এখনো জীবন্ত। স্বজন হারানোর কষ্ট, বিচার পাওয়ার অপেক্ষা এবং অপূর্ণ স্বপ্নের ভার নিয়েই দিন কাটছে তাদের।

শহীদ পরিবারগুলো বলছে, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, আর্থিক সহায়তা কিংবা বিভিন্ন সংগঠনের সহযোগিতা পেলেও তাদের মূল প্রত্যাশা হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার। তাদের মতে, অর্থ দিয়ে কিছুটা সহায়তা করা সম্ভব হলেও প্রিয়জন হারানোর শূন্যতা পূরণ করা যায় না।

চট্টগ্রাম সরকারি কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী মো. ওয়াসিম আকরাম ছিলেন পরিবারের বড় সন্তান। ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই মুরাদপুর এলাকায় আন্দোলনের সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে তার মৃত্যু হয়। এরপর থেকে তার পরিবার আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেনি।

ওয়াসিমের বাবা শফিউল আলম দীর্ঘদিন সৌদি আরবে কর্মরত ছিলেন। ছেলের মৃত্যুর খবর পেয়ে দেশে ফিরে আসেন তিনি। এরপর আর বিদেশে যাননি। পরিবারের সদস্যরা জানান, ছেলের মৃত্যুর পর তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন এবং প্রায়ই কক্সবাজারের পেকুয়ায় ছেলের কবরের পাশে সময় কাটান।

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পেকুয়ায় গিয়ে ওয়াসিমের কবর জিয়ারত করেন এবং তার মা জোসনা বেগমের হাতে ২০ লাখ টাকার রাষ্ট্রীয় সঞ্চয়পত্র তুলে দেন। তবে পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, আর্থিক সহায়তার চেয়ে এখন তাদের বড় দাবি ন্যায়বিচার।

ওয়াসিমের বাবা শফিউল আলম বলেন, যারা তার ছেলেকে হত্যা করেছে, তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি চান তিনি। ২০২৪ সালের ১৯ আগস্ট ওয়াসিমের মা বাদী হয়ে পাঁচলাইশ থানায় হত্যা মামলা করেন। পরে তদন্ত শেষে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ, সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলসহ ২২ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দাখিল করা হয়।

অন্যদিকে, ওমরগণি এমইএস কলেজের শিক্ষার্থী ফয়সাল আহমেদ শান্ত ছিলেন পরিবারের একমাত্র সন্তান। তার মৃত্যুর পর মা-বাবার জীবনেও নেমে এসেছে গভীর শূন্যতা। শান্তর মা কহিনুর আক্তার বলেন, অর্থ দিয়ে সন্তানের অভাব পূরণ করা সম্ভব নয়। যারা তার ছেলেকে হত্যা করেছে, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চান তিনি।

তৃতীয় নিহত মো. ফারুক ছিলেন নগরের একটি ফার্নিচারের দোকানের কর্মচারী। কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত না থাকলেও কর্মস্থলে যাওয়ার পথে শুলকবহর এলাকায় সহিংসতার মধ্যে পড়ে গুলিবিদ্ধ হন তিনি। কুমিল্লার বাসিন্দা ফারুক ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তার মৃত্যুর পর স্ত্রী ও সন্তানদের জীবন অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে।

সেদিনের ঘটনা

কোটা সংস্কারের দাবিতে ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই চট্টগ্রামের ষোলশহর রেলস্টেশনে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ সমাবেশ হওয়ার কথা ছিল। তবে সংঘাতের আশঙ্কায় শিক্ষার্থীরা পরে মুরাদপুর এলাকায় জড়ো হন।

দুপুরের পর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা মুরাদপুরে অবস্থান নেন। বিকেলে সেখানে সংঘর্ষ শুরু হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলা, পাল্টা প্রতিরোধ, ককটেল বিস্ফোরণ ও গুলির ঘটনায় মুরাদপুর, ২ নম্বর গেট ও বহদ্দারহাট এলাকা উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

সংঘর্ষের একপর্যায়ে কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হন। পরে তাদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তিনজনকে মৃত ঘোষণা করেন।

সেদিনের স্মৃতিচারণ করে আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত অনেকে বলেন, ১৬ জুলাইয়ের ঘটনা চট্টগ্রামে আন্দোলনের গতিপথ পাল্টে দেয়। পরবর্তী সময়ে এই আন্দোলন বৃহত্তর গণআন্দোলনে রূপ নেয়।

শহীদ ওয়াসিমকে স্মরণ করে তারা বলেন, তার মৃত্যু চট্টগ্রামের আন্দোলনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। দুই বছর পরও তার পরিবারসহ সব শহীদ পরিবারের একটাই প্রত্যাশা—ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচার।

সংশ্লিষ্ট খবর

Back to top button