শাহজালাল (রহ.) মাজারে মানতের এক গরু বিক্রি হয় ৭ বার

বাংলা টিভি ডেস্ক: হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারকে ঘিরে অনিয়ম, অর্থ ব্যবস্থাপনায় অস্বচ্ছতা এবং মানতের পশু নিয়ে প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, একটি প্রভাবশালী চক্র ধর্মীয় আবেগকে ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছে।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, মানতের জন্য আনা পশু একইভাবে একাধিকবার বিক্রি করার অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি মাজারের দানবাক্সের অর্থের হিসাব, ব্যক্তিগত নজরানা, পশু মানত এবং অন্যান্য আয় নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
সম্প্রতি সিলেট জেলা প্রশাসন মাজারের কয়েকটি দানবাক্স ও ডেক সিলগালা করে সিসিটিভি ক্যামেরার নজরদারিতে অর্থ গণনার ব্যবস্থা করে। এতে ২৫ দিনের ব্যবধানে নগদ ৬৪ লাখ টাকার বেশি অর্থ পাওয়া যায়। এছাড়া ১২ দেশের মুদ্রা, স্বর্ণালংকার এবং মানতের ৬৫টি ছাগল পাওয়া গেছে।
জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে মাজারের দান ব্যবস্থাপনায় প্রাতিষ্ঠানিক তদারকির অভাব ছিল। এ কারণে দানের অর্থ কোথায় যাচ্ছে এবং কত পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ হচ্ছে, তা নিয়ে স্বচ্ছতার ঘাটতির অভিযোগ ওঠে। পরে ১৮ জুন জেলা প্রশাসন দানবাক্সগুলো সিলগালা করে।
২২ জুন প্রথমবারের মতো সিসিটিভির সামনে দানবাক্স ও ডেক খোলা হয়। ওই সময় পাওয়া যায় ১৭ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪৯ টাকা। পরবর্তী সময়ে ১১ জুলাই আবার গণনা করা হলে পাওয়া যায় ৪৭ লাখ ১০ হাজার ১৫৩ টাকা। এ ছাড়া বিদেশি মুদ্রা, স্বর্ণালংকার ও বিভিন্ন চিরকুটও পাওয়া যায়।
সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, মাজারের অর্থ ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিন ধরে নির্দিষ্ট হিসাব পদ্ধতি ছিল না। স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্যই দানবাক্সগুলো সিলগালা ও নজরদারির ব্যবস্থা করা হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দানবাক্সে অর্থ জমা দেওয়ার পাশাপাশি কিছু ব্যক্তি ভক্তদের কাছ থেকে সরাসরি অর্থ গ্রহণ করতেন। এ বিষয়ে স্থানীয় কয়েকজন ভক্ত দাবি করেছেন, মাজারের অর্থ ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনার প্রয়োজন রয়েছে।
সাবেক জেলা প্রশাসক সারোয়ার আলম অভিযোগ করেন, দানবাক্সের বাইরে হাতে হাতে অর্থ সংগ্রহের কারণে প্রকৃত আয় পুরোপুরি হিসাবের মধ্যে আসছে না। তিনি বলেন, এ বিষয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, মাজারের সম্পত্তি, দোকানপাট, পুকুর, দানবাক্স ও ব্যক্তিগত নজরানা—এসবকে ঘিরে বড় ধরনের আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে ওরশসহ বিভিন্ন সময়ে ভক্তদের দেওয়া নগদ অর্থ, বিদেশি মুদ্রা ও মূল্যবান সামগ্রীর হিসাব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
মানতের পশু নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, মাজারে আনা গরু-ছাগল নির্দিষ্ট ব্যবস্থার মাধ্যমে বিক্রি করা হয় এবং একই পশু একাধিকবার বিক্রির ঘটনাও ঘটে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন অনেকে।
এদিকে মাজারকেন্দ্রিক কিছু ব্যক্তির বিরুদ্ধে ভক্তদের হয়রানি, জোরপূর্বক অর্থ আদায় এবং অপরাধী চক্রকে আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব কর্মকাণ্ডের কারণে মাজারের পবিত্র পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
সিলেটের নতুন জেলা প্রশাসক আব্দুল্লাহ আল মামুন জানিয়েছেন, মাজারের অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ খতিয়ে দেখতে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি তদন্ত শেষে প্রতিবেদন দেবে।
অন্যদিকে মাজারের মোতাওয়াল্লি ফতেহ উল্লাহ আল আমান অভিযোগগুলো অস্বীকার করে বলেন, সমস্যা থাকলে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা উচিত। তিনি দাবি করেন, মাজারের শৃঙ্খলা রক্ষায় সংশ্লিষ্টরা সবসময় কাজ করে আসছেন এবং পকেটমার বা প্রতারকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
দুর্নীতি দমন কমিশনের সিলেট কার্যালয় জানিয়েছে, কমিশনের অনুমোদন পাওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
মাজারের অর্থ ব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে এখন জেলা প্রশাসনের তদন্ত প্রতিবেদনের দিকে তাকিয়ে সংশ্লিষ্টরা।



