মায়ের মুখে খাবার তুলে দিতে গাছের ছাল ছাড়াচ্ছেন অন্ধ মোখলেস!

বাংলা টিভি ডেস্ক: ছেলেকে গুছিয়ে বাড়ির বাইরে পাঠিয়ে দরজায় দাঁড়িয়ে পেছন থেকে তাকিয়ে আছেন মা। ছেলে ঠিকমতো পথ চলছে তো, কোথাও পড়ে যাচ্ছে না তো, কোনো দুর্ঘটনা ঘটছে না তো? তবে বড় হলেও মায়ের চোখে সেই চিন্তা যেন রয়েই যায়, কারণ ছেলে চোখে দেখতে পান না।
অন্যদিকে একটু অসাবধাণতায় হতে পারে বড় বিপদ, কিন্তু তাতে কি? মায়ের মুখে খাবার তুলে দিতে সেসবের তোয়াক্কা না করেই ইটের সাহায্যে বারি দিয়ে গাছের ছাল ছাড়াচ্ছেন মোখলেস।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাট উপজেলার তেলিপাড়া গ্রামের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মুখলেসুর রহমান। মাত্র ছয় বছর বয়সে বাবাকে হারিয়ে শুরু হয় তার জীবনসংগ্রাম। আর এখন বৃদ্ধা মায়ের মুখে খাবার তুলে দিতে প্রতিদিন প্রায় দুই কিলোমিটার পথ একাই হেঁটে যান কাঠকাটা মিলে।
জানা যায়, অবিশ্বাস্য হলেও প্রায় ৫০ বছর ধরে একই পথ ধরে যাতায়াত করছেন মুখলেস। চোখে দেখতে না পেলেও স্মৃতি ও দীর্ঘদিনের অভ্যাসই যেন তার রোডম্যাপ। মিলে গাছের ছাল আলাদা করার কঠিন কাজ শেষে সেগুলো বস্তায় ভরে মাথায় করে ফেরেন বাড়িতে। পরে তার মা সেগুলো বিক্রি করে সামান্য আয়েই চলে তাদের সংসার। দৃষ্টিশক্তি না থাকলেও কারও কাছে হাত পাতেননি মুখলেস। দৃষ্টি প্রতিবন্ধী হয়েও ৫০ বছর ধরে বৃদ্ধা মায়ের প্রতি কর্তব্য পালন করছেন তিনি, যা বর্তমানে অনেক সন্তানের কাছে অনুপ্রেরণার। রাস্তা দেখতে পান না মোখলেস, কিন্তু দায়িত্বের পথ ঠিকই চিনেছেন—৫০ বছর ধরে যে পথের শেষ ঠিকানা রয়েছেন তার মা।
মুকলেসের মা রুলি বেগম বলেন, “ছোটবেলায় ছেলেকে ভাত খেতে দিলে কখনো থালার বদলে পানির গ্লাসে হাত দিত। তখন আমি বলতাম, ‘তুই কি দেখতে পাস না?’ সে কিছু বলত না। পরে বুঝতে পারি, আমার ছেলে আর দেখতে পাচ্ছে না।”
ছেলের কর্মজীবনের শুরুর কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, “প্রায় ১৪-১৫ বছর বয়সে বাড়ির পাশের ‘বশিরউদ্দিন স-মিলে’ যাওয়া শুরু করে মুকলেস। প্রথমে ছোট ছোট কাঠের খড়ি কুড়িয়ে, গাছের গুঁড়ির ছাল ছাড়িয়ে বাড়িতে আনত। আমার স্বামী সেগুলো শুকিয়ে বিক্রি করতেন।
“পরে মিলটি প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে কলেজ মোড় এলাকায় স্থানান্তর হলেও মুকলেস সেখানে কাজ করা বন্ধ করেনি। আমি ছেলেকে রাস্তা পর্যন্ত এগিয়ে দেই। এরপর সে একাই প্রায় দুই কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে মিলে যায়।”
বশিরউদ্দিন স-মিলের মালিক এটিএম হাসানুজ্জামান বলছিলেন, “মুকলেস ছোটবেলা থেকেই আমাদের মিলে কাজ করে। আমাদের সঙ্গে তার সম্পর্ক ৩৫ থেকে ৪০ বছরের। এখনও সে একাই প্রায় দুই কিলোমিটার পথ হেঁটে মিলের সামনে আসে। আমরা তাকে ভেতরে নিয়ে যাই।”
তিনি বলেন, “গাছের গুঁড়ির গায়ে ইট দিয়ে ঠুকে ঠুকে ছাল ছাড়ায়। খড়ির বস্তা ভর্তি হলে মাথায় তুলে দেই, রাস্তা ধরিয়ে দিই। সন্ধ্যায় তার মা রাস্তার পাশে অপেক্ষা করেন, সেখান থেকে বাড়ি নিয়ে যান। অন্ধ হয়েও সে কখনো কারও কাছে হাত পাতেনি। নিজের কষ্টের উপার্জনে মায়ের মুখে খাবার তুলে দেয়।”



