বাংলাদেশ

একজন ইউএনও কি কাউকে শারীরিকভাবে আঘাত করার আইনগত ক্ষমতা রাখেন?

বাংলা টিভি ডেস্ক: ময়মনসিংহের ত্রিশালে বালুর ঘাটে এক ইজারাদারের কর্মীকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আরাফাত সিদ্দিকী মারধর করছেন—এমন একটি ভিডিও সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওটি নিয়ে নানা আলোচনা ও প্রতিক্রিয়া তৈরি হলেও এর পূর্ণাঙ্গ সত্যতা, সময়-স্থান, ঘটনার আগে-পরে কী ঘটেছিল এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা কী ছিল—এসব বিষয় এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই হওয়া প্রয়োজন।

তবে এই ঘটনা সামনে এনে একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠেছে—একজন ইউএনও কি কাউকে শারীরিকভাবে আঘাত করার আইনগত ক্ষমতা রাখেন?

বাংলাদেশের আইনে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতা প্রয়োগ করেন। ফৌজদারি কার্যবিধির ১০(৬) ধারায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালনের বিধান রয়েছে। আবার ফৌজদারি কার্যবিধির ৬৪ ধারায় কোনো অপরাধ নির্বাহী বা বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে সংঘটিত হলে নির্দিষ্ট আইনগত শর্ত পূরণ সাপেক্ষে তিনি গ্রেপ্তার করতে বা গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিতে পারেন।

অর্থাৎ একজন ইউএনওর আইন প্রয়োগের ক্ষমতা রয়েছে, কিন্তু সেই ক্ষমতা অবশ্যই আইনি কাঠামো ও নির্ধারিত প্রক্রিয়ার মধ্যেই প্রয়োগ করতে হয়। কাউকে অপরাধী মনে হলেই নিজের হাতে শাস্তি দেওয়া বা শারীরিকভাবে আঘাত করার ক্ষমতা কোনো কর্মকর্তার পদমর্যাদা থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আসে না।

কেউ অপরাধ করলে তার বিরুদ্ধে মামলা হতে পারে, আইন অনুযায়ী তাকে গ্রেপ্তার করা যেতে পারে এবং আদালতের মাধ্যমে বিচার হতে পারে। প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধিবিধান অনুসরণ করাই নিয়ম। আইন প্রয়োগ করা আর নিজের হাতে শাস্তি দেওয়া—দুটি এক বিষয় নয়।

তাই ত্রিশালের ঘটনাটি যদি ভিডিও যাচাইয়ের পর সত্য বলে প্রমাণিত হয় এবং সেখানে কোনো নাগরিককে আইনগত প্রক্রিয়ার বাইরে শারীরিকভাবে আঘাত করার বিষয়টি নিশ্চিত হয়, তাহলে অবশ্যই তা প্রশাসনিক ও আইনগত তদন্তের দাবি রাখে।

কারণ একজন ইউএনও কেবল একজন সরকারি কর্মকর্তা নন; তিনি উপজেলা পর্যায়ে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধি। তার আচরণের মধ্য দিয়েই সাধারণ মানুষ অনেক সময় প্রশাসন ও রাষ্ট্রের চরিত্রকে বিচার করে। কোনো নাগরিক আইন ভঙ্গ করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রশাসনের দায়িত্ব। কিন্তু সেই ব্যবস্থা হতে হবে আইনসম্মত, নিরপেক্ষ ও প্রক্রিয়াভিত্তিক।

এ কারণে ত্রিশালের বালুর ঘাটের ঘটনাটির একটি নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত জরুরি। ভাইরাল ভিডিওটির মূল ফুটেজ সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা, ঘটনাস্থলে থাকা প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য নেওয়া, ইজারাদার ও তার কর্মীদের বক্তব্য শোনা এবং উপজেলা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্যও যাচাই করা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে ঘটনার আগে সেখানে কী পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, কোনো অবৈধ বালু উত্তোলন হচ্ছিল কি না, ইজারা নিয়ে কোনো বিরোধ ছিল কি না, সরকারি নির্দেশ অমান্য করা হয়েছিল কি না কিংবা প্রশাসনের কোনো অভিযান চলছিল কি না—এসব বিষয়ও তদন্তের অংশ হওয়া উচিত।

কারণ কয়েক সেকেন্ডের একটি ভিডিও দেখে পুরো ঘটনার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যেমন দায়িত্বশীল আচরণ নয়, তেমনি কোনো ভিডিওতে ক্ষমতার অপব্যবহারের প্রাথমিক প্রমাণ দেখা গেলে সেটি উপেক্ষা করাও ঠিক হবে না।

দেশের অসংখ্য ইউএনও নিষ্ঠা, সততা ও মানবিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার কারণে পুরো প্রশাসনকে প্রশ্নবিদ্ধ করা সমীচীন নয়। তবে কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্ব্যবহার বা আইনবহির্ভূত আচরণের বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ উঠলে সেটিরও যথাযথ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।

কারণ একজন সরকারি কর্মকর্তার হাতে থাকা ক্ষমতা তার ব্যক্তিগত ক্ষমতা নয়। রাষ্ট্র ও জনগণের স্বার্থে তাকে সেই ক্ষমতা অর্পণ করা হয়েছে। ফলে ক্ষমতার সঙ্গে জবাবদিহিও থাকতে হবে।

একইভাবে কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অতীতের কোনো রাজনৈতিক সরকার, দল বা পক্ষের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ থাকলেও সেটি প্রমাণ, নথি ও নিরপেক্ষ তদন্তের ভিত্তিতে যাচাই করা উচিত। রাজনৈতিক পরিচয়ের অভিযোগে কোনো কর্মকর্তাকে হয়রানি করা যেমন গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যবহার করে কোনো রাজনৈতিক পক্ষকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হলে সেটিও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

আমাদের প্রশাসন হতে হবে দলনিরপেক্ষ, আইননির্ভর, মানবিক ও জবাবদিহিমূলক।

প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত খুব সহজ—আইনের শাসন কি সবার জন্য সমান?

একজন সাধারণ নাগরিক আইন ভঙ্গ করলে তাকে আইনের মুখোমুখি হতে হয়। একইভাবে কোনো সরকারি কর্মকর্তা আইন বা সরকারি বিধি লঙ্ঘন করলে তার ক্ষেত্রেও আইন ও প্রশাসনিক বিধি অনুযায়ী জবাবদিহি নিশ্চিত হওয়া উচিত।

ইউএনও, ডিসি কিংবা অন্য যেকোনো সরকারি কর্মকর্তা—কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নন।

ক্ষমতা মানুষের অধিকার রক্ষা ও সেবা নিশ্চিত করার জন্য; কাউকে ভয় দেখানো, অপমান করা বা ব্যক্তিগতভাবে শাস্তি দেওয়ার জন্য নয়।

তাই ত্রিশালের বালুর ঘাটের ভাইরাল ভিডিওটির সত্যতা, ঘটনার পূর্ণ প্রেক্ষাপট এবং সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা দরকার। ভিডিওতে প্রদর্শিত আচরণ সত্য প্রমাণিত হলে দায়ী ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইন ও সরকারি বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক। আর ভিডিওটি যদি বিভ্রান্তিকরভাবে উপস্থাপিত হয়ে থাকে বা অভিযোগের সত্যতা না থাকে, সেটিও তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্টভাবে জনগণের সামনে তুলে ধরা হোক।

প্রশাসনের প্রতি মানুষের আস্থা রক্ষার একমাত্র পথ হলো—কাউকে আগেভাগে দোষী না বানানো, আবার ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগও ধামাচাপা না দেওয়া; বরং সত্য উদঘাটন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা।

সংশ্লিষ্ট খবর

Back to top button