গভীর রাতে ব্যবসায়ীর বাড়িতে হামলা, গৃহবধূ নিহত

কালীগঞ্জ (গাজীপুর) প্রতিনিধি: গাজীপুরের কালীগঞ্জে রাতের আধারে ব্যবসায়ী মঞ্জুর মিয়ার বাড়িতে ঢুকে তাণ্ডব চালায় একদল দুর্বৃত্ত। ডাকাতির উদ্দেশে আসা ওই দলের সদস্যরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে পরিবারের সদস্যদের ওপর হামলা চালায়। এতে কামরুন নাহার (৩৫) নামে এক গৃহবধূ নিহত হয়েছেন।
এ ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছেন তার স্বামী রড-সিমেন্ট ব্যবসায়ী মঞ্জুর মিয়া (৪১) এবং মেয়ে সানজিদা আক্তার মিম (১৬)।
শনিবার (১৫ আগস্ট) ভোররাত ৩টার দিকে উপজেলার নাগরী ইউনিয়নের নগরভেলা গায়েনবাড়ি এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাতে বৃষ্টির মধ্যে ১০ থেকে ১২ জনের একটি দল মুখে গামছা পেঁচিয়ে এবং হাফপ্যান্ট পরা অবস্থায় এলাকায় প্রবেশ করে। তারা প্রথমে আশপাশের কয়েকটি বাড়ির বাসিন্দাদের বাইরে বের হতে বাধা দেয়। পরে মঞ্জুর মিয়ার বাড়িতে ঢোকার চেষ্টা করে। একপর্যায়ে বাড়ির টয়লেটের ভেন্টিলেটর ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে তারা।
ঘরে ঢুকেই দুর্বৃত্তরা চাপাতি ও ছুরি দিয়ে মঞ্জুর মিয়া, তার স্ত্রী কামরুন নাহার ও মেয়ে সানজিদা আক্তার মিমকে এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকে। পরিবারের সদস্যদের চিৎকারে আশপাশের লোকজন এগিয়ে আসার চেষ্টা করলে দুর্বৃত্তরা গুলি করার হুমকি দেয়। এ সময় তারা বাইরে থাকা লোকজনকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেলও ছুড়তে থাকে।
পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে এবং আশপাশের মানুষের উপস্থিতি বাড়তে থাকায় হামলাকারীরা দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।
খবর পেয়ে স্বজন ও স্থানীয়রা আহতদের উদ্ধার করে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় কামরুন নাহারকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক। গুরুতর আহত মঞ্জুর মিয়াকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়া হয়েছে। তার অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন স্বজনরা। আহত মেয়ে সানজিদা আক্তার মিমকেও উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।
মঞ্জুর মিয়ার বড় ভাবি ষাটোর্ধ্ব আসমা বেগম বলেন, রাত আনুমানিক ৩টার দিকে দেবরের বাড়িতে ডাকাতির ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে তার স্বামী ও ছেলে সেখানে ছুটে যান এবং আহতদের হাসপাতালে নিয়ে যান। হাসপাতালে তার জা কামরুন নাহার মারা যান। গুরুতর আহত মঞ্জুর মিয়া ও মীমকে ঢাকায় হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।
মঞ্জুর মিয়ার চাচা সত্তরোর্ধ্ব নাছির ব্যাপারী বলেন, গভীর রাতে চিৎকার-চেঁচামেচি শুনে হাতে টর্চ নিয়ে তিনি বাড়ির বাইরে বের হন। এ সময় একজন দুর্বৃত্ত তাকে দ্রুত ঘরের ভেতরে চলে যেতে বলে। বাইরে থাকলে গুলি করার হুমকিও দেয়। পরে দুর্বৃত্তরা ইট ছুড়লে একটি ইট তার ডান পায়ে লাগে। আশপাশের লোকজনের ডাকাডাকি শুনে একপর্যায়ে হামলাকারীরা পালিয়ে যায়।
মঞ্জুর মিয়ার ভাই মোহন মিয়া বলেন, ঘটনাস্থলে এসে তিনি তার ভাই ও ভাবিকে আহত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। তাদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়। হাসপাতালে প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসক কামরুন নাহারকে মৃত ঘোষণা করেন। পরে মঞ্জুর মিয়া ও তার মেয়ে সানজিদাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়।
মোহন মিয়ার ধারণা, ডাকাতির উদ্দেশ্যেই দুর্বৃত্তরা বাড়িতে এসেছিল। তিনি জানান, একটি প্লট কেনার জন্য একটি সমিতি থেকে ২০ লাখ টাকা উত্তোলনের কথা ছিল। সেই টাকা উত্তোলন করা হয়েছিল কিনা, তিনি নিশ্চিত নন। তবে ওই টাকা উত্তোলনের খবর দুর্বৃত্তরা জেনে থাকতে পারে বলে তাদের ধারণা।
কালীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জাকির হোসেন বলেন, নিহত কামরুন নাহারের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ঘটনাটিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। হামলাকারীদের শনাক্ত ও গ্রেফতারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক দল কাজ করছে।
কালীগঞ্জ সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান জানান, একদল দুর্বৃত্ত বাড়িতে প্রবেশ করে গৃহকর্তা মঞ্জুর মিয়া, তার স্ত্রী ও মেয়েকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে আহত করে। পরে হাসপাতালে নেওয়ার পর মঞ্জুর মিয়ার স্ত্রী মারা যান। গুরুতর আহত মঞ্জুর মিয়া ঢাকার একটি হাসপাতালে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, বাড়ি থেকে কোনো অর্থ বা মালামাল লুট হওয়ার তথ্য এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। তবে ঘটনাটি অত্যন্ত নৃশংস। খবর পাওয়ার পর গাজীপুরের পুলিশ সুপার, জেলা পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট, পিবিআই, ডিবি, সিআইডি ও কালীগঞ্জ থানা পুলিশের সদস্যরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। ঘটনার প্রকৃত কারণ ও জড়িতদের শনাক্তে তদন্ত চলছে।



