বাংলাদেশ

এবার শাস্তির আওতায় আসছে যাত্রী-পথচারীরাও

বাংলা টিভি ডেস্ক: চালক ও গাড়ির মালিকের পাশাপাশি সড়ক আইন অমান্য করলে এবার যাত্রী ও পথচারীদেরও শাস্তির আওতায় আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাবিত ‘সড়ক নিরাপত্তা আইন, ২০২৬’-এ সড়কে শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বাড়াতে যাত্রী, পথচারী, অভিভাবক এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে।

খসড়া আইনে চালককে দ্রুত গাড়ি চালাতে উৎসাহ দেওয়া, ঝুঁকি নিয়ে গাড়িতে ওঠা, চলন্ত গাড়ির জানালা দিয়ে হাত বা মাথা বের করা এবং নির্ধারিত আসনের বাইরে বসার মতো কর্মকাণ্ডকে যাত্রীর অপরাধ হিসেবে বিবেচনার প্রস্তাব রয়েছে। এসব অপরাধে সর্বোচ্চ এক হাজার টাকা জরিমানা হতে পারে।

একইভাবে ফুটপাত ব্যবহার না করে সড়কে চলাচল করলে পথচারীকেও সর্বোচ্চ এক হাজার টাকা জরিমানা করার বিধান প্রস্তাব করা হয়েছে। পথচারীদের ফুটপাত, নির্ধারিত পারাপার স্থান এবং নিরাপদ সড়কদ্বীপ ব্যবহারের বিষয়টি বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হয়েছে।

তবে দেশের বিভিন্ন স্থানে ফুটপাত দখল হয়ে থাকা, ফুটপাত না থাকা কিংবা চলাচলের অনুপযোগী হওয়ার বিষয়টিও সামনে এসেছে। খসড়া আইনে নিরাপদ ফুটপাত, পর্যাপ্ত পারাপার ব্যবস্থা ও সড়কদ্বীপ তৈরির দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ওপর দেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

শিশুদের নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও নতুন কিছু বিধান যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। ছয় বছরের কম বয়সী শিশুকে মোটরসাইকেলের সহযাত্রী হিসেবে নেওয়া নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব রয়েছে। একই সঙ্গে লাইসেন্স না থাকা অবস্থায় কোনো অপ্রাপ্তবয়স্ককে মোটরসাইকেল চালাতে দিলে মালিক বা অভিভাবককেও দায়ী করার বিধান রাখা হচ্ছে।

মোটরসাইকেলের চালক ও সহযাত্রী উভয়ের জন্য মানসম্মত হেলমেট বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাবও রয়েছে। পাশাপাশি ১৩৫ সেন্টিমিটারের কম উচ্চতার অথবা ১৪ বছরের কম বয়সী শিশুকে মোটরযানের সামনের আসনে বসানো যাবে না। বয়স, উচ্চতা ও ওজন বিবেচনায় শিশুদের জন্য বিশেষ নিরাপত্তা আসন ব্যবহারের কথাও বলা হয়েছে।

গতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও প্রস্তাবিত আইনে বেশ কিছু নতুন বিধান রয়েছে। জাতীয় পর্যায়ে মোটরযানের সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ৮০ কিলোমিটার এবং শহর এলাকায় ৪০ কিলোমিটার নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ জন্য স্পিড ক্যামেরা ও স্বয়ংক্রিয় গতি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালুর কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া পথচারী পারাপারের স্থান, মোড় ও রেলক্রসিংয়ের ৫০ মিটারের মধ্যে ওভারটেকিং নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব রয়েছে। কুয়াশা, বৃষ্টি, ধুলাবালি বা অতিরিক্ত জনসমাগমের স্থানেও ওভারটেকিং নিষিদ্ধ করা হতে পারে। ক্লান্ত বা ঘুমঘুম অবস্থায় গাড়ি চালানো এবং বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া এক হাতে স্টিয়ারিং নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধেও শাস্তির বিধান রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। এসব অপরাধে প্রথমবার সর্বোচ্চ এক মাস কারাদণ্ড বা পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা কিংবা উভয় দণ্ড এবং চালকের এক পয়েন্ট কেটে নেওয়ার বিধান থাকতে পারে।

মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানোর বিষয়টি শনাক্ত করতে চালকের নিঃশ্বাস, রক্তসহ বিভিন্ন নমুনা পরীক্ষার সুযোগ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। দুর্ঘটনার পর দ্রুত নমুনা সংগ্রহের ব্যবস্থাও থাকবে। নমুনা দিতে অস্বীকৃতি জানালে সর্বোচ্চ তিন মাস কারাদণ্ড বা ১০ হাজার টাকা জরিমানা কিংবা উভয় দণ্ড হতে পারে।

নিরাপদ যানবাহন নিশ্চিত করতে এয়ারব্যাগ, সিটবেল্ট, স্পিড গভর্নর, ইলেকট্রনিক স্ট্যাবিলিটি কন্ট্রোল, অ্যান্টিলক ব্রেকিং সিস্টেম, জিপিএস ট্র্যাকার, ড্যাশ ক্যামেরা ও ড্রাইভিং মনিটরিং সিস্টেম ব্যবহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি অটোনোমাস ইমার্জেন্সি ব্রেকিং ও বুদ্ধিমান গতি নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি ব্যবহারের কথাও রয়েছে।

নতুন গাড়ির নিরাপত্তা যাচাইয়ের জন্য ‘নিউ কার অ্যাসেসমেন্ট প্রোগ্রাম’ এবং সড়কের নিরাপত্তা মান নির্ধারণে ‘স্টার রেটিং’ চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে। সড়কের পরিকল্পনা, নকশা ও নির্মাণ পর্যায় থেকে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান বা বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে নিরাপত্তা অডিট বাধ্যতামূলক করার কথাও বলা হয়েছে।

যানবাহনের ফিটনেস, চালকের যোগ্যতা, রুট পারমিট, অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা, অতিরিক্ত যাত্রী বা মালামাল পরিবহন এবং চালক-কর্মীদের স্বাস্থ্যসুরক্ষার ক্ষেত্রে মালিকের দায় নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে। চালক, কন্ডাক্টর ও পরিবহনকর্মীদের নিয়োগপত্র দেওয়াও বাধ্যতামূলক করা হতে পারে। দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে প্রথমবার সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার এবং পরবর্তী প্রতিবার ১০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান প্রস্তাব করা হয়েছে।

অন্যদিকে সড়কের নকশা, নির্মাণ ও ব্যবস্থাপনায় আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি একক বা যৌথভাবে দায়ী হতে পারেন। এ ধরনের অপরাধে সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদণ্ড বা কমপক্ষে এক লাখ টাকা জরিমানা কিংবা উভয় দণ্ডের প্রস্তাব রয়েছে।

বর্তমানে ‘সড়ক নিরাপত্তা আইন, ২০২৬’-এর খসড়া মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে রয়েছে। মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর এটি মতামত ও পর্যালোচনার জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। পরবর্তী যাচাই-বাছাই শেষে সংসদে উপস্থাপনের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।

প্রস্তাবিত আইনটি ২০১৮ সালের সড়ক পরিবহন আইন বাতিল করবে না। বরং বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ আইন-২০১৭, মহাসড়ক আইন-২০২১সহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য আইনের পরিপূরক হিসেবে কার্যকর হবে।

আইনটির মূল উদ্দেশ্য হিসেবে চালক, যাত্রী ও পথচারীর আচরণ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি নিরাপদ যানবাহন ও সড়ক অবকাঠামো নিশ্চিত করা, গতি নিয়ন্ত্রণ, দুর্ঘটনা তদন্ত এবং দুর্ঘটনার পর জরুরি চিকিৎসা ও উদ্ধারসেবাকে একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু আইন প্রণয়ন করলেই সড়ক নিরাপদ করা সম্ভব নয়। নিরাপদ ফুটপাত ও সড়ক অবকাঠামো, আধুনিক যানবাহন, প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল, পর্যাপ্ত অর্থায়ন এবং কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে তবেই প্রস্তাবিত আইনটি সড়ক নিরাপত্তায় বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারে।

সংশ্লিষ্ট খবর

Back to top button