বাংলাদেশ

বিয়েতে নতুন জামাইকে কেন আস্ত খাসি দেওয়া হয়?

বাংলা টিভি ডেস্ক: বিয়ে শুধু দুজন মানুষের নতুন জীবনের সূচনা নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে দুই পরিবারের আনন্দ, আতিথেয়তা ও নানা সামাজিক রীতি। বাঙালি সংস্কৃতিতে বর ও বরযাত্রীকে বিশেষভাবে আপ্যায়নের চল বহুদিনের। কনের বাড়িতে বরযাত্রীর আগমন থেকে শুরু করে খাবারের আয়োজন—সবখানেই দেখা যায় ‘জামাই আদর’-এর ছাপ।

এই আয়োজনের তালিকায় থাকতে পারে পোলাও, বিরিয়ানি, রোস্ট, কাবাব, মাছ-মাংস, মিষ্টি ও ফল। আবার অনেক এলাকায় বরের জন্য আলাদা করে বড় ডালা বা থালায় খাবার সাজিয়ে দেওয়ার রীতিও রয়েছে। কোথাও সেই ডালায় থাকে খাসির মাংস, আবার কোথাও দেওয়া হয় আস্ত খাসি বা খাসির মাথা।

সম্প্রতি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ায় একটি বিয়েকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা শুরু হলে নতুন করে সামনে আসে এই পুরোনো রীতি। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, জাপানপ্রবাসী এক যুবক বিয়ের খাবারের আয়োজনে অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। বরপক্ষের জন্য আস্ত খাসির মাংস না থাকায় আপত্তি জানান তিনি। পরে বিয়ে না করেই চলে যাওয়ার কথাও আলোচনায় আসে।

ঘটনাটি নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা হলেও এর মধ্য দিয়ে ‘জামাই ভোজ ডালা’ বা বরকে বিশেষ খাবার দিয়ে আপ্যায়নের প্রচলিত রীতিটি আবারও আলোচনায় এসেছে।

আস্ত খাসির এত কদর কেন?

বাঙালির বিভিন্ন সামাজিক ও পারিবারিক আয়োজনে খাসির মাংস দীর্ঘদিন ধরে মর্যাদাপূর্ণ খাবার হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। বিশেষ করে গ্রামীণ ও আঞ্চলিক সমাজে বিয়ে, মেজবানসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অতিথি আপ্যায়নে খাসির মাংসের আলাদা গুরুত্ব রয়েছে।

বর ও বরযাত্রীকে বিশেষ সম্মান জানানোর অংশ হিসেবে অনেক এলাকায় পোলাওয়ের সঙ্গে খাসির মাংস পরিবেশন করা হয়। কোথাও বড় ডালা বা থালায় মাংস সাজিয়ে দেওয়া হয়, আবার কোনো কোনো এলাকায় খাসির মাথা কিংবা বড় মাংসের টুকরাও পরিবেশনের রীতি রয়েছে।

এ কারণে অনেক পরিবারের কাছে আস্ত খাসি শুধু খাবার নয়; বরং সম্মান, সামর্থ্য ও আতিথেয়তা প্রদর্শনের একটি প্রতীক হয়ে উঠেছে।

তবে এই রীতির নির্দিষ্ট কোনো ঐতিহাসিক সূচনা বা একক উৎসের কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। দীর্ঘদিনের সামাজিক আতিথেয়তা, আঞ্চলিক সংস্কৃতি ও পারিবারিক প্রথার মধ্য দিয়েই এটি গড়ে উঠেছে বলে মনে করা হয়।

‘জামাই আদর’ থেকে বড় আয়োজন

বাংলার সামাজিক সংস্কৃতিতে জামাইকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতা বেশ পুরোনো। একসময় পান-সুপারি, মিষ্টি, শরবতসহ নানা উপহার ডালা বা ঝুড়িতে করে দেওয়ার চল ছিল। সময়ের সঙ্গে সেই আয়োজন বড় হয়েছে এবং এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিভিন্ন ধরনের খাবার।

বিয়ের মতো বড় অনুষ্ঠানে পরিবারের সামর্থ্য ও আতিথেয়তা প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠেছে এই জামাই ভোজ। অনেক পরিবারে বরের জন্য ১০-১৫টি বা তারও বেশি পদ সাজিয়ে দেওয়ার রীতিও দেখা যায়।

তবে সব অঞ্চলে একই ধরনের আয়োজন হয় না। কোথাও খাসির মাংসকে গুরুত্ব দেওয়া হয়, আবার কোথাও মাছ, মিষ্টি কিংবা অন্য কোনো খাবার বিশেষ মর্যাদা পায়।

বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় বড় থালা বা ডালায় খাবার পাঠানোর এই আয়োজনকে ভিন্ন ভিন্ন নামে ডাকা হয়। নাম ও খাবারের ধরন আলাদা হলেও মূল উদ্দেশ্য একই—বর ও বরপক্ষকে সম্মান ও আপ্যায়ন করা।

ঐতিহ্য যখন সামাজিক চাপ

‘জামাই আদর’ বাঙালি সংস্কৃতির আনন্দময় একটি অংশ হলেও কখনো কখনো এই রীতিই পরিবারের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে। জামাই ভোজে নির্দিষ্ট সংখ্যক পদ থাকতেই হবে, খাসি না হলে সম্মান থাকবে না কিংবা অন্য পরিবারের চেয়ে বড় আয়োজন করতে হবে—এমন ধারণা অনেক পরিবারকে সামর্থ্যের বাইরে খরচ করতে বাধ্য করে।

কে কত বড় ডালা দিলেন, কত ধরনের মাংস বা কত দামি খাবারের আয়োজন করলেন—এসব দিয়ে যদি পারিবারিক মর্যাদা বিচার করা হয়, তাহলে সম্পর্কের জায়গায় হিসাব-নিকাশের মানসিকতা তৈরি হতে পারে।

অথচ বিয়ের মূল সৌন্দর্য থাকার কথা পারস্পরিক সম্মান, বোঝাপড়া ও আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার মধ্যে।

খাবার নয়, সম্পর্কই আসল

একেক পরিবারের সংস্কৃতি ও প্রত্যাশা একেক রকম। কোনো পরিবারের কাছে আস্ত খাসি দেওয়া বিশেষ সম্মানের বিষয় হতে পারে, আবার অন্য পরিবারের কাছে সেটি গুরুত্বপূর্ণ নাও হতে পারে। তাই কোনো নির্দিষ্ট খাবার বা আঞ্চলিক রীতি যদি কোনো পক্ষের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়, তাহলে বিয়ের আগে তা নিয়ে আলোচনা করে নেওয়াই ভালো।

শেষ পর্যন্ত ‘জামাই ভোজ ডালা’ কিংবা আস্ত খাসি দেওয়ার মতো রীতির উদ্দেশ্য হওয়া উচিত বর ও বরপক্ষকে সম্মান জানানো, আনন্দ ভাগ করে নেওয়া এবং দুই পরিবারের সম্পর্ক আরও দৃঢ় করা।

অর্থাৎ, নতুন জামাইকে আস্ত খাসি দেওয়ার পেছনে মূলত রয়েছে দীর্ঘদিনের আতিথেয়তা, সামাজিক মর্যাদা ও ভালোবাসা প্রকাশের সংস্কৃতি। তবে এই ঐতিহ্য তখনই সুন্দর, যখন তা আনন্দ ও সম্মানের অংশ থাকে—দাবি, অধিকার কিংবা সম্পর্কের শর্ত হয়ে না দাঁড়ায়।

সংশ্লিষ্ট খবর

Back to top button