একাই শিক্ষক-দপ্তরী-পরিচ্ছন্নতাকর্মী, ৩২ বছর ধরে স্কুলের হাল দোলনের হাতে

বাংলা টিভি ডেস্ক: তিনি একই সঙ্গে শিক্ষক, দপ্তরী ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী। প্রতিদিন প্রায় এক কিলোমিটার পথ হেঁটে স্কুলে আসেন। সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত একাই নেন সব ক্লাস। এভাবেই কেটে গেছে ৩২ বছর। একটি মাত্র কক্ষের ছোট্ট স্কুলটিকে একাই আগলে রেখেছেন দোলন ভৌমিক।
কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার বিন্নাটি ইউনিয়নের কালটিয়া গ্রামের বিন্নাটি মিশু বিদ্যা নিকেতনের একমাত্র শিক্ষক তিনি। বিষয়ভিত্তিক আলাদা কোনো শিক্ষক নেই, নেই আধুনিক অবকাঠামোও। তারপরও থেমে নেই শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা। বরং এই ছোট্ট স্কুল থেকেই প্রতিবছর উঠে আসছে সাফল্যের গল্প।
দোলনের কাছে ক্লাসরুম মানেই শুধু পাঠদান নয়। শিক্ষার্থীরা যেন প্রাইভেট বা কোচিংয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে না পড়ে, সে জন্য ক্লাসেই যতটা সম্ভব বিষয়গুলো সহজ করে বুঝিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন তিনি।
একটি টিনের ঘর, সেটিও বেশ পুরোনো ও জীর্ণ। মাসিক বেতন মাত্র ২০০ টাকা। অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত সেই টাকাটুকুও দিতে পারে না। কেউ কেউ পড়াশোনা করছে সম্পূর্ণ বিনা বেতনে। কিন্তু এসব কোনো কিছুই দোলনের পাঠদানে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি।
শিক্ষকতার পাশাপাশি স্কুলের ঘর পরিষ্কার করা, ঝাড়ু দেওয়া, প্রয়োজনীয় কাজ সামলানো—সবই করতে হয় তাকে। কোনো অতিথি এলে নিজের হাতেই চা তৈরি করে দেন। অর্থাৎ একই মানুষকে এখানে কখনো শিক্ষক, কখনো দপ্তরী, আবার কখনো পরিচ্ছন্নতাকর্মীর ভূমিকায় দেখা যায়।
স্কুলটির অবকাঠামো দেখে এর শিক্ষার্থীদের সাফল্যের কথা শুনলে অনেকেই অবাক হন। এই প্রতিষ্ঠান থেকে পড়াশোনা করে কেউ এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন, কেউ মেডিকেল কলেজে, আবার কেউ বিসিএস ক্যাডার হয়েছেন।
একজন শিক্ষক ও সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও শিক্ষার্থীদের এমন সাফল্যই দোলনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
তিনি মনে করেন, শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন বড় হলে সীমিত সুযোগও সবসময় বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। তাই নিজের সামর্থ্যের সর্বোচ্চটুকু দিয়ে তাদের পড়াশোনায় সহায়তা করে যাচ্ছেন তিনি।
ময়মনসিংহের যে গ্রামে দোলন ভৌমিকের বেড়ে ওঠা, সেখানে তিনিই ছিলেন প্রথম নারী যিনি এসএসসি পাস করেছিলেন। পরে সরকারি বিদ্যালয়ে শিক্ষক হওয়ার জন্য পরীক্ষায় অংশ নেন। সেখানে সফল হতে না পারলেও হাল ছাড়েননি।
এরপর ব্র্যাকের মাধ্যমে শিক্ষকতার সুযোগ পান। সেই শুরু। দেখতে দেখতে পেরিয়ে গেছে ৩২ বছর।
এই দীর্ঘ সময়ে স্কুলের দায়িত্বের পাশাপাশি সংসারও সামলাতে হয়েছে তাকে। তার স্বামী ধর্মপ্রচারের কাজে যুক্ত। দুই ছেলের মধ্যে একজন সেনাবাহিনীতে কর্মরত, অন্যজন এখনো পড়াশোনা করছেন।
দীর্ঘ পথচলায় স্কুলটি যেন তার জীবনেরই একটি অংশ হয়ে উঠেছে। তাই শরীর খারাপ হলেও অনেক সময় স্কুলে চলে আসেন তিনি। ছুটির দিন ছাড়া নিয়মিত চলে তার পাঠদান।
মাস শেষে দোলন ভৌমিকের হাতে আসে মাত্র তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা। অর্থের হিসাবে এটি খুবই সামান্য। কিন্তু নিজের কাজের মূল্যায়ন তিনি টাকার অঙ্কে করেন না।
তার কাছে সবচেয়ে বড় আনন্দ—এই ছোট্ট স্কুলের বেঞ্চে বসা কোনো শিক্ষার্থী যখন বড় হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়, মেডিকেল কলেজে সুযোগ পায় কিংবা বিসিএস ক্যাডার হয়।
বিন্নাটি মিশু বিদ্যা নিকেতনে নেই বড় কোনো ভবন, নেই একাধিক শিক্ষক, নেই আধুনিক সুযোগ-সুবিধা। কিন্তু আছে একজন শিক্ষকের অদম্য নিষ্ঠা এবং শিক্ষার্থীদের বড় হওয়ার স্বপ্ন।
এই দুইয়ের ওপর ভর করেই ৩২ বছর ধরে এগিয়ে চলছে ছোট্ট এই স্কুলটি। আর দোলন ভৌমিকের গল্প হয়ে উঠেছে—একজন শিক্ষকের দায়িত্ববোধ, ভালোবাসা ও আত্মত্যাগের এক অনন্য উদাহরণ।



