বাংলাদেশ

এক রাতেই নির্মাণ! গাইবান্ধার ‘জ্বীনের মসজিদ’ ঘিরে রহস্য

গাইবান্ধা প্রতিনিধি( ডিজিটাল): গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার একটি প্রত্যন্ত গ্রামে দাঁড়িয়ে আছে প্রাচীন এক মসজিদ। নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ না হলেও বছরে দুই ঈদে মুসল্লিদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে এর প্রাঙ্গণ। মসজিদটির নির্মাণকাল কিংবা প্রতিষ্ঠাতার বিষয়ে নেই কোনো নির্ভরযোগ্য লিখিত ইতিহাস। অথচ স্থানীয়দের মুখে মুখে ছড়িয়ে আছে নানা রহস্যময় গল্প।
‎
‎কেউ বলেন, এক রাতেই অলৌকিকভাবে নির্মাণ হয়েছিল মসজিদটি। আবার কেউ মনে করেন, এটি মুঘল আমলের স্থাপনা। অসম্পূর্ণ অবস্থায় থাকায় স্থানীয়দের কাছে এটি পরিচিত ‘ভাঙা মসজিদ’ নামে। আর রহস্যময় নানা লোককথার কারণে অনেকে একে ডাকেন ‘জ্বীনের মসজিদ’ বলেও।
‎
‎পলাশবাড়ী উপজেলার বেতকাপা ইউনিয়নের রায়তি নড়াইল গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, নিরিবিলি পরিবেশে দাঁড়িয়ে থাকা পুরোনো এই স্থাপনাটিকে ঘিরে মানুষের কৌতূহল এখনো কমেনি।
‎
‎এক রাতের নির্মাণের গল্প, স্থানীয়দের মুখে প্রচলিত জনশ্রুতি অনুযায়ী, বহু বছর আগে এক রাতে অদৃশ্য শক্তির মাধ্যমে মসজিদটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। কথিত আছে, ভোর হওয়ার আগেই মসজিদের প্রায় পুরো নির্মাণকাজ শেষ হয়ে যায়।
‎
‎তবে নির্মাণকাজ চলার সময় রাস্তা দিয়ে এক পথিক যাওয়ার ঘটনায় নির্মাণকারীরা কাজ অসম্পূর্ণ রেখেই চলে যান এমন একটি গল্পও প্রচলিত রয়েছে। এরপর থেকেই মসজিদটি অসম্পূর্ণ অবস্থায় পড়ে থাকে। আর সেই অসম্পূর্ণতার কারণেই এর নাম হয় ‘ভাঙা মসজিদ’।
‎তবে এক রাতেই মসজিদ নির্মাণ কিংবা অদৃশ্য শক্তির মাধ্যমে নির্মাণের বিষয়টির কোনো ঐতিহাসিক বা বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এগুলো মূলত স্থানীয়দের মধ্যে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসা জনশ্রুতি।
‎
‎
‎মুঘল আমলের স্থাপনা। মসজিদটি কত বছরের পুরোনো, কে এটি নির্মাণ করেছিলেন কিংবা ঠিক কোন সময়ে এর নির্মাণ হয়েছিল এসব প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তর দিতে পারেন না স্থানীয়রা।
‎তবে তাদের ধারণা, মসজিদটি মুঘল আমলের হতে পারে। বিশেষ করে সম্রাট আকবরের শাসনামলে এ অঞ্চলে নির্মিত বিভিন্ন প্রাচীন স্থাপনার সঙ্গে এর সময়কাল মিলতে পারে বলে অনেকে মনে করেন।
‎
‎কিন্তু এই দাবির পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো শিলালিপি, সরকারি নথি বা নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক দলিল পাওয়া যায়নি। ফলে মসজিদটির প্রকৃত ইতিহাস জানতে প্রয়োজন প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান ও গবেষণা। শত বছরের পুরোনো তেঁতুলগাছ মসজিদের পাশেই রয়েছে বিশাল আকৃতির একটি পুরোনো তেঁতুলগাছ। গাছটির প্রকৃত বয়স কেউ নিশ্চিত করে বলতে না পারলেও স্থানীয়দের দাবি, তাদের বাপ-দাদারাও গাছটিকে এমন বড় অবস্থায় দেখে গেছেন।
‎এই গাছকে ঘিরেও রয়েছে নানা লোককথা। স্থানীয়দের কেউ কেউ বিশ্বাস করেন, গভীর রাতে গাছটির আশপাশে জ্বীনদের আনাগোনা হয়। এমনকি সেখানে জ্বীনদের নাচ-গানের গল্পও প্রচলিত রয়েছে।
‎
‎তবে এসব গল্পেরও কোনো বৈজ্ঞানিক বা ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই। স্থানীয় সংস্কৃতি ও লোকবিশ্বাসের অংশ হিসেবেই এসব কাহিনি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে টিকে আছে। দুই ঈদে বসে মানুষের মিলনমেলা। মসজিদটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এখানে নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা হয় না। স্থানীয় মুসল্লিরা বছরে দুই ঈদে এখানে ঈদের নামাজ আদায় করেন।
‎
‎ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার দিনে আশপাশের গ্রামের মানুষ এখানে জড়ো হন। তখন প্রাচীন এই মসজিদ ও এর আশপাশের এলাকা হয়ে ওঠে মানুষের মিলনমেলা। মানত নিয়েও আসেন দূর-দূরান্তের মানুষ। মসজিদটি ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে রয়েছে নানা বিশ্বাস ও মানতের প্রচলন। সন্তান লাভ, চাকরি পাওয়া কিংবা মনের কোনো আশা পূরণ হলে অনেকে এখানে এসে মানত করেন। মানত পূরণ হলে কেউ কেউ সিন্নি বা তবারক বিতরণ করেন।
‎
‎স্থানীয়দের বিশ্বাসকে কেন্দ্র করে দূর-দূরান্ত থেকেও মানুষ এই স্থানে আসেন। ফলে মসজিদটি শুধু ধর্মীয় স্থাপনা হিসেবে নয়, স্থানীয় লোকবিশ্বাস ও সংস্কৃতির একটি অংশ হিসেবেও পরিচিতি পেয়েছে।
‎
‎মসজিদের পাশেই রয়েছে কয়েকটি পুরোনো কবর। স্থানীয়দের দাবি, এখানে আল্লাহর ওলি হিসেবে পরিচিত ১৫ জন ব্যক্তির কবর রয়েছে। তবে কবরগুলো কার এবং তাদের পরিচয় কী সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য লিখিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তাই এ দাবিকেও স্থানীয় জনশ্রুতি হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
‎
‎সময়ের সঙ্গে প্রাচীন স্থাপনাটির অবস্থা কিছুটা নাজুক হয়ে পড়েছিল। ঐতিহ্যের স্মৃতি ধরে রাখতে স্থানীয়রা নিজেদের উদ্যোগে মসজিদটির সংস্কার করেছেন। দেয়ালে চুন-সুরকি ব্যবহার এবং নতুন করে রং করার ফলে পুরোনো স্থাপনাটিতে লেগেছে নতুনের ছোঁয়া।
‎
‎তবে সংস্কারের কারণে মসজিদটির মূল স্থাপত্য ও ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য কতটা পরিবর্তিত হয়েছে, তা নিয়েও ভবিষ্যতে বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন প্রয়োজন বলে মনে করেন স্থানীয়রা।
‎
‎রায়তি নড়াইল গ্রামের ‘ভাঙা মসজিদ’কে ঘিরে রয়েছে ইতিহাস, বিশ্বাস, লোককথা ও রহস্যের মিশেল। এক রাতের নির্মাণের গল্প থেকে শুরু করে জ্বীনের আনাগোনা, প্রাচীন তেঁতুলগাছ ও কথিত ওলিদের কবর সব মিলিয়ে স্থাপনাটি স্থানীয় মানুষের কাছে বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্র।
‎তবে কোনটি ইতিহাস আর কোনটি কেবল জনশ্রুতি তা এখনো স্পষ্ট নয়। মসজিদটির প্রকৃত বয়স, নির্মাণকাল, স্থাপত্যশৈলী ও প্রতিষ্ঠাতার পরিচয় জানতে প্রয়োজন প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ ও ঐতিহাসিক গবেষণা।
‎
‎কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই ‘ভাঙা মসজিদ’ তাই শুধু একটি পুরোনো স্থাপনা নয়; এটি রায়তি নড়াইল গ্রামের মানুষের স্মৃতি, বিশ্বাস ও লোককথারও একটি অংশ। রহস্যের আড়ালে থাকা এর প্রকৃত ইতিহাস একদিন গবেষণার মাধ্যমে উন্মোচিত হবে এমন প্রত্যাশা স্থানীয়দের।

সংশ্লিষ্ট খবর

Back to top button