
বাংলা টিভি ডেস্ক: চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জে বিএনপির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এবার আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে ‘তালাক’ শব্দটি। দল থেকে বহিষ্কৃত নেতাদের এক পক্ষ ‘তালাকপ্রাপ্ত নারী’ হিসেবে আখ্যা দিচ্ছে, অন্যদিকে ধানের শীষের প্রার্থীকে ‘জনগণের ভোটে তালাকপ্রাপ্ত’ বলে পাল্টা মন্তব্য করা হচ্ছে। দুই পক্ষের এমন বক্তব্যে স্থানীয় বিএনপির রাজনীতিতে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। চাঁদপুর-৪ (ফরিদগঞ্জ) আসনে বিএনপির দলীয় মনোনয়ন পান দলটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির ব্যাংকিং ও রাজস্ববিষয়ক সম্পাদক এবং সাবেক সংসদ সদস্য লায়ন হারুনুর রশিদ।
তবে দলীয় মনোনয়ন মেনে না নিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেন উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক এম এ হান্নান। দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় তাকে এবং আরও কয়েকজন নেতাকে বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হয়। একই সময় উপজেলা বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের কমিটিও স্থগিত করা হয়।
নির্বাচনে অবশ্য ধানের শীষের প্রার্থী লায়ন হারুনুর রশিদকে হারিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী এম এ হান্নান জয়ী হন।
এরপর থেকেই ফরিদগঞ্জের বিএনপির রাজনীতি মূলত তিনটি বলয়ে বিভক্ত হয়ে পড়ে। একটি পক্ষ লায়ন হারুনুর রশিদের নেতৃত্বাধীন ধানের শীষের পক্ষে অবস্থান নেয়। অন্য পক্ষ নির্বাচিত স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য এম এ হান্নানের সঙ্গে সক্রিয় থাকে। আরেকটি বলয়ের নেতৃত্বে রয়েছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও মনোনয়নপ্রত্যাশী মোতাহার হোসেন পাটওয়ারী।
সম্প্রতি মোতাহার হোসেন পাটওয়ারী ও এম এ হান্নানের মধ্যকার রাজনৈতিক দূরত্ব কিছুটা কমেছে। এরপর মোতাহার হোসেনের নেতৃত্বে বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীর অনুসারীদের নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক কর্মসূচি শুরু হয়েছে।
এরই অংশ হিসেবে গত ২৭ আগস্ট বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে মোতাহার হোসেন পাটওয়ারীর সভাপতিত্বে একটি প্রস্তুতি সভা হয়। সেখানে দুই পক্ষের নেতাকর্মীদের উপস্থিতি ছিল।
এর প্রতিক্রিয়ায় ২৯ আগস্ট ধানের শীষের প্রার্থীর পক্ষে আয়োজিত বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর প্রস্তুতি সভায় বক্তব্য দেন উপজেলা যুবদলের সাবেক আহ্বায়ক নাছির পাটওয়ারী।
তিনি মোতাহার হোসেন পাটওয়ারীকে উদ্দেশ করে বলেন, বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত নেতারা ‘তালাকপ্রাপ্ত নারীর’ মতো। তার প্রশ্ন, দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য হয়ে মোতাহার হোসেন কীভাবে দল থেকে বহিষ্কৃত ও দলের সিদ্ধান্তের বিরোধিতাকারীদের নিয়ে সভা-সমাবেশ করেন।
এর কয়েক দিনের মধ্যেই পাল্টা বক্তব্য দেন মোতাহার হোসেন পাটওয়ারী। মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) বিকেলে নিজের অনুসারী, বহিষ্কৃত নেতাকর্মী এবং ধানের শীষের বিরোধিতাকারীদের নিয়ে আয়োজিত মিছিল-পূর্ব সমাবেশে তিনি বক্তব্য দেন।
নাছির পাটওয়ারীকে ‘টুপি ছাড়া হুজুর’ আখ্যা দিয়ে মোতাহার হোসেন বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জনগণ ভোটের মাধ্যমে ধানের শীষের প্রার্থী লায়ন হারুনুর রশিদকে ‘তালাক’ দিয়েছে। জনগণের ভোটে যারা প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন, তাদের সঙ্গে কীভাবে রাজনীতি করা হচ্ছে—এমন প্রশ্নও তোলেন তিনি।
দুই পক্ষের নেতাদের এমন পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের পর ফরিদগঞ্জের বিএনপিতে ‘তালাক’ এখন রীতিমতো রাজনৈতিক আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে যেকোনো সময় উপজেলা ও পৌর বিএনপির নতুন কমিটি ঘোষণা হতে পারে—এমন আলোচনা রয়েছে। ফলে সম্ভাব্য কমিটিতে কারা জায়গা পাচ্ছেন, তা নিয়ে নেতাকর্মীদের মধ্যেও চলছে নানা হিসাব-নিকাশ।
রাজনৈতিক ‘তালাক’ নিয়ে এই বিতর্কের মধ্য দিয়ে ফরিদগঞ্জ বিএনপির দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ বিরোধও আরও প্রকাশ্যে এসেছে বলে মনে করছেন স্থানীয় নেতাকর্মীরা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির এক নেতা বলেন, ফরিদগঞ্জ বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল মূলত দলের একটি অংশই ধরে রেখেছে। বিষয়টি কমবেশি সবাই জানেন। কিন্তু সমস্যা হলো—‘ভাসুরের নাম কেউ মুখে আনতে চান না।’



