বাংলাদেশ

ঠাকুরগাঁওয়ের ভূল্লীতে জমির নামজারি বন্ধ, চরম ভোগান্তিতে সেবাগ্রহীতারা

ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি: প্রশাসনিক রূপান্তরের নানা জটিলতায় ঠাকুরগাঁওয়ের নবগঠিত ভূল্লী উপজেলায় জমির নামজারি বা খারিজের (e-Mutation) কার্যক্রম প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। নতুন উপজেলা ঘোষণার পর ডিজিটাল ভূমি ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থায় সীমানা নির্ধারণ, বালাম বইয়ের রেকর্ড পৃথকীকরণ এবং অনলাইন সার্ভার সমন্বয়ে জটিলতা দেখা দেওয়ায় মাসের পর মাস ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ সেবাগ্রহীতারা।

নামজারি সম্পন্ন না হওয়ায় জমি কেনাবেচা, ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ এবং উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পত্তি বণ্টনের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনিক এই জটিলতার কারণে ভূল্লী এলাকার হাজারো মানুষ সময় ও অর্থ দুটোই হারাচ্ছেন।

স্থানীয় ভুক্তভোগী ও দলিল লেখকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভূল্লী উপজেলা গঠনের আগে এ অঞ্চলের ইউনিয়নগুলো ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা ভূমি অফিসের অধীনেই ভূমিসেবা পেত। নতুন উপজেলা গঠনের পর মৌজা ও খতিয়ানের তথ্য নতুন প্রশাসনিক কোডে স্থানান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হয়। তবে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও নতুন ভূমি অফিসের প্রয়োজনীয় জনবল ও পূর্ণাঙ্গ প্রশাসনিক কাঠামো এখনও কার্যকর হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া সরকারি ‘স্মার্ট ভূমি সেবা’ পোর্টালে আবেদন করতে গিয়ে কারিগরি সমস্যার মুখে পড়ছেন অনেকে। অনেক ক্ষেত্রে ভূল্লী এলাকার মৌজাগুলো সঠিকভাবে প্রদর্শিত না হওয়ায় আবেদন প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে। ফলে অসংখ্য আবেদন সদর উপজেলা ও ভূল্লী ভূমি কর্তৃপক্ষের মধ্যে আটকে রয়েছে।

নামজারি না হওয়ায় স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও এর প্রভাব পড়ছে। জরুরি প্রয়োজনে জমি বিক্রি করে চিকিৎসা বা সন্তানের শিক্ষার ব্যয় মেটাতে চাইলেও অনেকেই তা করতে পারছেন না। একইভাবে কৃষক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা জমি বন্ধক রেখে ব্যাংক ঋণ নিতে গিয়ে হালনাগাদ নামজারি পর্চা না থাকায় সমস্যায় পড়ছেন।

অন্যদিকে, প্রশাসনিক জটিলতাকে কাজে লাগিয়ে একশ্রেণির দালাল ও মধ্যস্বত্বভোগী সক্রিয় হয়ে উঠেছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। সার্ভারের সমস্যা দ্রুত সমাধান করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।

ভূল্লী বাজারের কয়েকজন বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, নতুন উপজেলা হওয়ায় তারা আশা করেছিলেন সরকারি সেবা আরও সহজলভ্য হবে। কিন্তু সামান্য একটি জমির নামজারি করতেও সদর ও ভূল্লী ভূমি অফিসে বারবার যেতে হচ্ছে। তাদের দাবি, দ্রুত স্থায়ী সহকারী কমিশনার (ভূমি) নিয়োগ এবং নিরবচ্ছিন্ন অনলাইন ভূমিসেবা নিশ্চিত করা হোক।

স্থানীয় ব্যবসায়ী হাসান বলেন, নামজারি বন্ধ থাকায় তিনি জমি বিক্রি করতে পারছেন না। জরুরি প্রয়োজনে অর্থের প্রয়োজন হলেও জমি বিক্রি করতে না পারায় সমস্যায় পড়েছেন তিনি। দ্রুত এ সমস্যার সমাধান চান এই ব্যবসায়ী।

ভূল্লী সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের দলিল লেখক বাবুল বলেন, নামজারি কার্যক্রম বন্ধ থাকায় জমির দলিল সম্পাদনের সংখ্যাও কমে গেছে। এতে দলিল লেখকরাও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। দ্রুত সমস্যার সমাধান প্রয়োজন বলে জানান তিনি।

ভূল্লী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সাদ্দাম হোসেন বলেন, নতুন উপজেলা হিসেবে প্রশাসনিক কার্যক্রম পুরোপুরি চালু করতে কিছুটা সময় প্রয়োজন হচ্ছে। ভূমিসেবা নিয়ে যে সমস্যাগুলো তৈরি হয়েছে, সেগুলো সমাধানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ চলছে। সাধারণ মানুষ যাতে হয়রানির শিকার না হন এবং দ্রুত নামজারি সেবা পান, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগীর মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ না দিয়ে সরাসরি ভূমি অফিস থেকে সেবা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

জেলা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট এক রাজস্ব কর্মকর্তা জানান, নতুন উপজেলা গঠনের পর ডিজিটাল ডাটাবেজ স্থানান্তর এবং বালাম বইয়ের রেকর্ড আলাদা করতে কারিগরি কিছু সময় প্রয়োজন হয়। ভূল্লীর মানুষের সাময়িক এই ভোগান্তির বিষয়টি প্রশাসনের নজরে রয়েছে। ভূমি মন্ত্রণালয়ের আইসিটি বিভাগের সহযোগিতায় সার্ভারসংক্রান্ত জটিলতা দ্রুত নিরসন করে স্বাভাবিক ভূমিসেবা নিশ্চিত করার কাজ চলছে।

সংশ্লিষ্ট খবর

Back to top button