শ্রমিকের কাজ আর মানুষের সাহায্যে পড়াশোনা, মাখন আজ বিসিএস ক্যাডার

বাংলা টিভি ডেস্ক: সাত মাস বয়সে বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ, আঁকড়ে ধরার একমাত্র অবলম্বন বাবাকেও হারান ছোটবেলায়, দাদির আদরে বেড়ে ওঠা। চরম অর্থকষ্টে কৃষি ও শ্রমিকের কাজ আর মানুষের সহযোগিতায় পড়াশোনা করে আমিনুল হক মাখন আজ বিসিএস ক্যাডার।
ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রাম কান্দানিয়া ভাটিপাড়ায় জন্ম মাখনের। জীবন যাকে শৈশবেই শিখিয়েছে অভাব আর পরম প্রিয়জন হারানোর যন্ত্রণা, কঠোর পরিশ্রমে কেটেছে কৈশোর। তবুও অভাবের কাছে নতি স্বীকার করেননি মাখন। ষষ্ঠ-সপ্তম শ্রেণিতে ইট ভেঙেছেন, রডের কাজ করেছেন, করেছেন কৃষিকাজ। নবম শ্রেণি থেকে শুরু করেন টিউশনি। ২০১২ সাল, মাখন তখন অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। পরম আশ্রয় বাবা, না ফেরার দেশে চলে গেলেন। পায়ের তলা থেকে যেন মাটি সরে গেল। তবে ভেঙে পড়েননি মাখন। কৃষিকাজ, টিউশনের পাশাপাশি প্রতিদিন ৭ কিলোমিটার পথ সাইকেল চালিয়ে গিয়েছেন কলেজে।
আমিনুল হক মাখন বলেন, ‘আমার বয়স তখন ছয় বা সাত মাস, তখন বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ হয় ও মা চলে যান। মা কেমন হয় সেটা দেখেছি আমি যখন পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ি। এর আগে মাকে আমি দেখিওনি। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় বাবা মারা যান। আমার কোনো ভাইবোন ছিল না। চাচা-চাচি, দাদি ও ফুফুরাই আমাকে আগলে রেখেছেন।
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের পরিবারটি ছিল খুবই দরিদ্র পরিবার। চাচা রিকশা চালিয়ে পরিবার চালান। মাটির ঘর ছিল আমাদের। আমার পড়াশোনার জন্য গ্রামের মানুষরাই সহযোগিতা করেছে। ৯৫ ভাগ খরচ এসেছে তাদের কাছ থেকে। এছাড়াও আমি কৃষি কাজ করেছি, ইট ভাঙার কাজ করেছি, রডের কাজ করেছি। সেই আয় থেকে পড়াশোনার খরচ ও পরিবারে দিয়েছি। বন্ধুরা যখন মাঠে খেলত, বেড়াতে যেত, তখন আমাকে কাজ করতে হতো। শিশু হিসেবে তা কষ্টের ছিল। তখন মনে হয়েছে, আমার সামনে কোনো পথ নেই। পড়াশোনাটাই আমার একমাত্র সম্বল।’
২০১৫ সালে মাধ্যমিক কান্দানিয়া উচ্চ বিদ্যালয় ও ২০১৭ সালে শাহাবুদ্দিন ডিগ্রি কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শেষে স্বপ্নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন সমাজকল্যাণ বিভাগে। বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েও অভাব পিছু ছাড়েনি। বিভিন্ন শিক্ষাবৃত্তি ও টিউশনির করে চালিয়ে যান পড়াশোনা। বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকতেই শুরু করেন চাকরির প্রস্তুতি। পাঁচটি বিসিএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। ৪৬তম বিসিএসে পেয়েছেন শিক্ষা ক্যাডারের সুপারিশ। ৪৯তম বিশেষ বিসিএসেও শিক্ষা ক্যাডারে হয়েছেন গ্যাজেটভুক্ত। মাখন বলেন, ২০২১ সালের মার্চ থেকে চাকরির প্রস্তুতিতে পুরোপুরি মনোযোগ দেই। কোনো কোচিংয়ে পড়িনি। বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে প্রস্তুতি নিয়েছি।
কঠিন সময়ে বাবা-মায়ের মতোই মাখনকে আগলে রেখেছেন চাচা-চাচি।। এমন সফলতার দিনে তাদের চোখে আজ আনন্দশ্রু। চাচা আবদুল খালেক বলেন, সাত মাসের বাচ্চা থুইয়া ওর মা চলে গেছিল। অনেক কষ্ট কইরা ওরে বড় করছি। কোনো দিন ভাতিজা মনে করি নাই। আল্লাহ ওরে বড় করছেন।
চাচি মিনারা খাতুন বলেন, নিজের বুকের দুধ খাওয়াইয়া ওরে বড় করছি। ওর বাবা আমার হাত ধইরা কইছিল, তোমার তিনটা ছেলে আর এইটা আরও একটা। চারজনরে এক চোখে দেখবা। আমি কোনো দিন ওরে আলাদা করি নাই।
আমিনুলের পড়াশোনার পেছনে তার পরিবারের পাশাপাশি পাশে ছিলো পুরো গ্রাম। কেউ টাকা দিয়েছেন, কেউ খাতা-কলম কিনে দিয়েছেন। কেউবা কিনে দিয়েছেন পোশাক। পরীক্ষার ফি দেওয়ার সময়ও সহায়তা পেয়েছেন তিনি। স্থানীয় বাসিন্দা মাসুদ করিম বলেন, ‘স্কুলজীবন থেকেই আমরা ওর পাশে ছিলাম। খাতা, কলম, পোশাক লাগলে দিয়েছি। কলেজে ফরম পূরণের সময়ও টাকা দিয়েছি। কারণ, ও ভালো ছাত্র ছিল। মনে হতো, ওর পাশে দাঁড়ালে একদিন আমাদের এলাকার গর্ব হবে। সত্যিই সে আজ সফল। সে আমাদের এলাকার গর্ব। মানুষ চেষ্টা করলে যে সব সম্ভব সেটা মাখন দেখিয়ে দিয়েছে।
তবে এমন সফলতার দিনেও আক্ষেপ মাখনের কণ্ঠে। বলেন, যারা আমার জন্য সবচেয়ে বেশি কষ্ট করেছেন, সেই বাবা-দাদি আমার সাফল্য দেখে যেতে পারেননি। দাদি সব সময় বলতেন, তুমি একদিন বড় অফিসার হবা। বাবা আমার জন্য কোনো সংসারও করেননি। তিনিও আমার সাফল্য দেখে যেতে পারেননি এটাই আফসোস।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় সাবিকুন্নাহার সিনথিয়ার সঙ্গে পরিচয় হয় মাখনের। ২০২৪ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর তারা বিয়ে করেন। কঠিন সময়ে স্ত্রীর কাছ থেকে মানসিক সমর্থন পেয়েছেন বলে জানান আমিনুল হক। তিনি বলেন, ‘সফলতার জন্য সততা, পরিশ্রম ও ধৈর্য দরকার। এর সঙ্গে সৃষ্টিকর্তার কাছে দোয়া করতে হবে। আমি মনে করি, সততা, পরিশ্রম ও ধৈর্য যার মধ্যে আছে, তিনি সব ক্ষেত্রেই সফল হতে পারবেন।



