বাংলাদেশ

অসহায় বিধবারা বাদ, ৩০ কেজি চালের তালিকায় ইউপি সদস্যের স্ত্রী-বোন-ভাবির নাম!

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি (ডিজিটাল): সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার কুলঞ্জ ইউনিয়নে সরকারি খাদ্যসহায়তা কর্মসূচির উপকারভোগী নির্বাচনে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে এক ইউপি সদস্যের বিরুদ্ধে। অভিযোগ অনুযায়ী, ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য শামীম আহমেদের স্ত্রী, অবিবাহিত বোন ও ভাইয়ের স্ত্রীর নাম রয়েছে ভালনারেবল উইমেন বেনিফিট (ভিডব্লিউবি) কর্মসূচির তালিকায়। পাশাপাশি ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) উপকারভোগীর তালিকায় রয়েছে ওই ইউপি সদস্য ও তাঁর দুই ভাইয়ের নাম। এদিকে, প্রকৃত অসহায় ও বিধবা নারীরা সরকারি সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

অভিযুক্ত ইউপি সদস্য শামীম আহমেদ কুলঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য। পরিবারের সদস্যদের নাম সরকারি সহায়তার তালিকায় থাকার বিষয়টি স্বীকার করলেও তাঁদের নামে বরাদ্দ করা চাল দরিদ্র মানুষের মধ্যে বিতরণ করেন বলে দাবি করেছেন তিনি।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কুলঞ্জ ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডে ভিডব্লিউবি কর্মসূচির উপকারভোগীর সংখ্যা ৫৪ জন। তালিকার ৩৫ নম্বরে শামীম আহমেদের স্ত্রী মোছা. লুবনা আক্তার, ৩৬ নম্বরে তাঁর অবিবাহিত বোন কলি আক্তার এবং ৪১ নম্বরে তাঁর ভাইয়ের স্ত্রী রীমা আক্তারের নাম রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, তাঁরা একই পরিবারের সদস্য।

ভিডব্লিউবি কর্মসূচির আওতায় প্রত্যেক উপকারভোগী মাসে ৩০ কেজি চাল পান। জমিহীন, চরম অসচ্ছল, বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্ত নারীদের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এ কর্মসূচির অন্যতম লক্ষ্য।

এ ছাড়া তালিকায় ওমানপ্রবাসী আন্নান মিয়ার স্ত্রী হামিদা বেগম এবং দুবাইপ্রবাসী এক ব্যক্তির মা রেশমা বেগমের নাম রয়েছে বলে জানা গেছে। সচ্ছল ও ব্যবসায়ী পরিবারের সদস্যদের নামও তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আর্থিক অবস্থা এবং সরকারি সহায়তা পাওয়ার যোগ্যতা যাচাই করা প্রয়োজন।

নিজের স্ত্রী, বোন ও ভাইয়ের স্ত্রীর নাম ভিডব্লিউবি কর্মসূচির তালিকায় থাকার বিষয়ে ইউপি সদস্য শামীম আহমেদ বলেন, “আমি প্রতি বছর ৫-৬ শত মণ ধান পাই। আমার এগুলো লাগে না। আমার স্ত্রী, বোন ও ভাইয়ের বউয়ের নামে যে চাল পাই, সেগুলো গরিব মানুষদের বিলিয়ে দিই।”

টিসিবির উপকারভোগীর তালিকায় নিজের ও দুই ভাইয়ের নাম থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, “তিন ভাইয়ের মধ্যে আমরা দুই ভাই এক পরিবারে আছি। আরেক ভাই আলাদা থাকেন। এগুলো আসলে অনলাইনে করেছিলাম, হয়ে গেছে।”

তবে পরিবারের সদস্যদের নামে সরকারি সহায়তা গ্রহণের ক্ষেত্রে নির্ধারিত যোগ্যতার শর্ত পূরণ করা হয়েছে কি না এবং তাঁদের নামে বরাদ্দ করা চাল দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণের দাবির সত্যতা কী, তা যাচাইয়ের বিষয়।

সরকারি সহায়তার তালিকা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় কয়েকজন দরিদ্র ও বিধবা নারী। তাঁদের অভিযোগ, প্রকৃত অসহায় নারীদের বাদ দিয়ে জনপ্রতিনিধিদের পছন্দের ব্যক্তিদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

নাচনী গ্রামের বিধবা স্বপ্না বেগম বলেন, “আমার স্বামী নেই, ছেলেসন্তানও নেই। তিনটা মেয়ে নিয়ে অসহায় অবস্থায় আছি। গ্রামের অনেক ধনী লোক ৩০ কেজি চাল পায়, অথচ আমাকে কেউ দেয় না।”

একই ধরনের অভিযোগ করেছেন নাচনী গ্রামের বিধবা সাজিদা বেগম, চমৎকার বিবি, মেহেরজান ও হারেছা এবং হাতিয়া আকিলনগর গ্রামের জরিফুল নেছা ও নূরজাহান। তাঁদের অভিযোগ, আর্থিক অসচ্ছলতা ও পারিবারিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নেওয়ার পরিবর্তে তালিকা তৈরিতে স্বজনপ্রীতি করা হয়েছে।

এ বিষয়ে দিরাই উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয়ের ইন্সট্রাক্টর লক্ষ্মী রানী দাস বলেন, “বিষয়টি নিয়ে স্যারের সঙ্গে আলাপ করে তাঁদের নামীয় চাল আটক করে দেবো।”

দিরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সনজীব সরকার বলেন, ইউনিয়ন কমিটির মাধ্যমে উপকারভোগীদের তালিকা চূড়ান্ত করা হয়। সরকারি সহায়তার তালিকায় ইউপি সদস্যের নিজের কিংবা পরিবারের সদস্যদের নাম দেওয়ার সুযোগ নেই। এ বিষয়ে কেউ লিখিত অভিযোগ করলে তাঁদের নাম বাদ দেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

উল্লেখ্য, আগে এ কর্মসূচির নাম ছিল ভিজিডি। ২০২২ সালের ১৬ অক্টোবর এক পরিপত্রের মাধ্যমে এর নাম পরিবর্তন করে ভিডব্লিউবি করা হয়।

অভিযোগের বিষয়ে কুলঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান একরার হোসেন বলেন, “আমি চাইলে আমার ভাই, ভাতিজা ও আত্মীয়স্বজনের নাম দিতে পারি, কিন্তু আমি এরকম করি না। এসব কাজকে সমর্থনও করি না। যে বা যারা এসব কাজে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হোক। আমি আইনের পক্ষে, আইনকে শ্রদ্ধা করি।”

এদিকে, শামীম আহমেদ ইউপি সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে কৃষি কার্ড, বিধবা ভাতা ও অন্যান্য সরকারি সহায়তা বিতরণেও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ করে আসছেন এলাকাবাসীর একটি অংশ।

তাঁদের দাবি, সরকারি সুবিধা বণ্টনে প্রকৃত অসহায় ও যোগ্য ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ভিডব্লিউবি ও টিসিবির উপকারভোগীর তালিকা যাচাই, তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের আর্থিক অবস্থা পর্যালোচনা এবং সহায়তা থেকে বঞ্চিত হওয়ার অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

সরকারি সহায়তা কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য দরিদ্র ও অসচ্ছল মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তাই তালিকা প্রণয়নে নির্ধারিত যোগ্যতার শর্ত যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখে প্রকৃত উপকারভোগীদের অধিকার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

সংশ্লিষ্ট খবর

Back to top button