সাভারে ভুল চিকিৎসায় ১১ বছর বয়সী শিশুর মৃত্যু, হাসপাতাল ভাঙচুর

বাংলা টিভি ডেস্ক: ঢাকার সাভারে নাকের পলিপাস ও টনসিলের অস্ত্রোপচার করাতে গিয়ে ১১ বছর বয়সী এক শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ক্ষুব্ধ স্বজনেরা সংশ্লিষ্ট হাসপাতালে ভাঙচুর চালান। পরে হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য কর্মীদের কাউকে সেখানে পাওয়া যায়নি বলে জানা গেছে।
বুধবার (২১ অক্টোবর) দুপুরে সাভার পৌর এলাকার উলাইলে অবস্থিত আব্বাস স্পেশালাইজড হাসপাতালে এ ঘটনা ঘটে। নিহত শিশুটির নাম আব্রাহাম (১১)। সে মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইর উপজেলার দুবাইপ্রবাসী আব্দুল আলীমের ছেলে।
শিশুটির মা কনা আক্তারের অভিযোগ, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন না করেই তার ছেলের অস্ত্রোপচার করা হয়। চিকিৎসকের অবহেলার কারণেই সন্তানের মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারও দাবি করেছেন তিনি।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, নাকে পলিপাস ও টনসিলের সমস্যা দেখা দেওয়ায় কয়েক দিন আগে আব্রাহামকে আব্বাস স্পেশালাইজড হাসপাতালে চিকিৎসক মো. সুমন হোসেনের কাছে নেওয়া হয়। চিকিৎসক দ্রুত অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দিয়ে ইসিজি ও ইকো পরীক্ষা করাতে বলেন। মঙ্গলবার হাসপাতালে ইসিজি করা হলেও চিকিৎসক না থাকায় ইকো পরীক্ষা করা সম্ভব হয়নি। পরে বাইরে থেকে ইকো করিয়ে আনার কথা বলা হলে চিকিৎসক জানান, ইসিজি স্বাভাবিক থাকায় ইকো পরীক্ষার আর প্রয়োজন নেই।
স্বজনদের দাবি, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী বুধবার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে আব্রাহামকে হাসপাতালে নেওয়া হলে তাকে সরাসরি অস্ত্রোপচারকক্ষে নেওয়া হয়। প্রায় দেড় ঘণ্টা পর ওটির সামনে চিকিৎসক ও নার্সদের অস্বাভাবিক তৎপরতা লক্ষ করেন পরিবারের সদস্যরা। কিছুক্ষণ পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, শিশুটির শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়েছে এবং তাকে দ্রুত আইসিইউতে নেওয়া প্রয়োজন।
এরপর হাসপাতালের লোকজনের পরামর্শে দুপুর ২টার দিকে আব্রাহামকে সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা পরীক্ষা করে তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউর মেডিকেল অফিসার আব্দুল আহাদ জানান, শিশুটিকে হাসপাতালে আনার সময় তার হৃদস্পন্দন পাওয়া যায়নি। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তার মৃত্যুর বিষয়টি স্বজনদের জানানো হয়। প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, আব্বাস স্পেশালাইজড হাসপাতালে অজ্ঞান করার ওষুধ প্রয়োগের পরপরই শিশুটির শারীরিক অবস্থার গুরুতর অবনতি ঘটে।
আব্রাহামের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর হাসপাতালে জড়ো হন ক্ষুব্ধ স্বজনেরা। এ সময় সেখানে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে অভিযুক্ত চিকিৎসক সুমন হোসেন, হাসপাতালের মালিক মো. আব্বাস উদ্দিনসহ চিকিৎসক, নার্স ও কর্মচারীরা সেখান থেকে চলে যান বলে জানা গেছে। তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
এদিকে হাসপাতালটি কার্যত কর্মীশূন্য হয়ে পড়ায় সেখানে চিকিৎসাধীন অন্য রোগীরাও সমস্যায় পড়েন। অস্ত্রোপচার করা এক রোগী জানান, দুপুরের ঘটনার পর থেকে হাসপাতালে কোনো চিকিৎসক বা নার্সকে পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে রোগীরা অসহায় অবস্থায় রয়েছেন। হাসপাতালের এক নিরাপত্তাকর্মীর ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার পর অধিকাংশ রোগী ও কর্মী চলে গেছেন। বর্তমানে সেখানে দু-তিনজন রোগী অবস্থান করছেন।
সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. ফজলে বারী জানান, হাসপাতালটির অস্ত্রোপচারকক্ষে এক শিশুর মৃত্যুর খবর তারা পেয়েছেন। এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সাভার মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) ফজর আলী জানান, শিশুটির মরদেহের সুরতহাল করার সময় শরীরে দৃশ্যমান কাটাছেঁড়ার চিহ্ন পাওয়া যায়নি। তবে নাক ও মুখ দিয়ে রক্তক্ষরণের লক্ষণ দেখা গেছে। প্রাথমিক তথ্যে অজ্ঞান করার ওষুধ প্রয়োগের পর শিশুটির শারীরিক অবস্থার অবনতির বিষয়টি উঠে এসেছে। পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে এবং এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
তবে শিশুটির মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।



