দেশবাংলা

বাচ্চু রাজাকারের ভয়ে মুখ খুলতে চায় না শহীদ পরিবারের সদস্যরা

স্বাধীনতা যুদ্ধে ফরিদপুরের বোয়ালমারীতে একই দিনে নির্মম গণহত্যার শিকার হয় ৬টি গ্রামের ৩৩ জন নিরীহ মানুষ। হত্যা, লুণ্ঠন ও অগ্নিসংযোগের স্মৃতি নিয়ে এখনো বেঁচে আছে অনেকে। কিন্তু বিজয়ের ৪৮ বছর পেরিয়ে গেলেও সেদিনের হত্যাযজ্ঞে নির্মমভাবে শাহাদত বরণ করা, লুন্ঠন ও অগ্নিসংযোগের ভুক্তভোগি পরিবারের সদস্যরা আজও রাজাকারদের ভয়ে মুখ খুলতে নারাজ।

১৯৭১ সালের ১৬ মে, প্রথম সূর্য সবে রক্তিম আভা নিয়ে উদিত হয়ে পূব আকাশে, গ্রামের মানুষ দৈনন্দিন কাজে বের হয়েছে ঘর থেকে। মানবতা বিরোধী অপারধে মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত পালাতক আসামী মওলানা আবুল কালাম আজাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকারের আহ্বানে মেজর নেওয়াজের নের্তৃত্বে তিনশত পাকিস্তানি আর্মির একটি চৌকশ দল যশোর ক্যান্টনমেন্ট থেকে বোয়ালমারীর হাসামদিয়াতে একটি বিশেষ অপারেশনে আসে।

উদ্দ্যোশ ততকালীন বৃহত্তর ফরিদপুর জেলার মুজিব বাহিনীর ডেপুটি কমাণ্ডার শাহ্ মোঃ আবু জাফরকে গ্রেফতার অথবা হত্যা। পাকহানাদার বাহিনী বীর মুক্তিযোদ্ধা শাহ্ জাফরকে না পেয়ে হাসামদিয়াসহ আশ-পাশের ৫টি গ্রামে চালায় নৃশংস হত্যাযজ্ঞ।

বাচ্চু রাজাকারের উস্কানিতে উপজেলার রাজাপুর, রামনগর, শ্রীনগর, ময়েনদিয়া ও পোয়াইলের ৩৩ জন নিরীহ মানুষকে হত্যার পাশা-পাশি চালানো হয় ব্যাপক লুটপাট,অগ্নিসংযোগ ও নারী ধর্ষণ। জ্বালিয়ে দেওয়া হয় ময়েনদিয়া বাজারসহ কয়েকশত ঘরবাড়ি, পাকহানাদার বাহিনীর দেওয়া আগুনে লোকনাথ সাহার ভূষিমালের গুদাম আগুন জ্বলে প্রায় তিন মাস।

এই হত্যাকাণ্ড, লুটতারাজ, অগ্নিসংযোগে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর সাথে বাচ্চু রাজাকারের বাহিনীর প্রায় একশ জন রাজাকার অংশ নেয়। এখনো দাপটের সাথে এলাকায় ঘুরে বেড়ায় তারা। জামায়েত ইসলামীর সাবেক নেতা আবুল কালাম আজাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকার পালিয়ে গেলেও তার ভয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধে নির্মম গণহত্যার শিকার পরিবারের সদস্যরা আজও মুখ খুলতে চায় না।

মুখ খোলা দূরে থাক সেদিনের সেই হত্যাযজ্ঞের ইতিহাস ক্যামেরার সামনে তুলে ধরতে আঁতকে ওঠে অনেকেই। এমনকি বাচ্চু রাজাকারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্যদান করে নিরাপত্তাহীনতায় জীবন যাপন করছেন অনেকে।

বাচ্চু রাজাকারের হাতে নির্মমভাবে নিহত হন বোয়ালমারীর কলারণ গ্রামের সম্ভ্রান্ত জমিদার বাবু সুধাংশ মোহন রায়। তার ছেলে বাবু মনিময় রায়কেও গুলি করা হয়। পালিয়ে গিয়ে প্রাণে বেঁচে যান তিনি। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হলে আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে স্বাক্ষীদেন মনিময় রায়।

বাচ্চু রাজাকারের ফাঁসির আদেশ হলেও রায় দেখে যেতে পারেননি তিনি। স্বাক্ষী দেওয়ায় এখনো বিভিন্নভাবে হুমকি দেওয়া হয় তার পরিবারকে। পরিবারটি জানায় রাজাকারদের ভয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভূগছে তারা।

ইন্টারপোলের মাধ্যমে নরঘাতক যুদ্ধাপরাধী মওলানা আবুল কালাম আজাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকার পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকুক খুঁজে বের করে দেশে এনে রায় কার্যকারের দাবি করলেন বোয়ালমারী মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমাণ্ডার অধ্যাপক আব্দুর রশিদ।

বাচ্চু রাজাকার, তার দোসর ও তাকে পালিয়ে যেতে সাহায্যকারীদের খুঁজে বের করে বিচারের সম্মুখিন করাসহ তার রায় কার্যকার করা এবং আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্যদানকারী পরিবারের সদস্যদের জানমালের নিরাপত্তা দেওয়ার দাবী স্থানীয়দের।

খান মোস্তাফিজুর রহমান, বোয়ালমারী ও আলফাডাঙ্গা প্রতিনিধি

সংশ্লিষ্ট খবর

Back to top button