নানা সংকটে বাংলাদেশ জুট মিল; বিপাকে কর্মচারী

||শরীফ ইকবাল রাসেল,নরসিংদী||
বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশন (বিজেএমসি) নিয়ন্ত্রণাধীন নরসিংদীর পলাশ উপজেলার ঘোড়াশাল শিল্প এলাকায় অবস্থিত বাংলাদেশ জুটমিলে পাট সঙ্কট দেখা দিয়েছে। মিলে পাট না থাকায় দৈনিক উৎপাদন ক্ষমতা ৪২ থেকে ১০ টনে নেমে এসেছে। সেই সাথে ছয় সপ্তাহ যাবৎ বন্ধ রয়েছে শ্রমিক কর্মচারীদের বেতন। ফলে সাড়ে তিন হাজার শ্রমিক ও কর্মকর্তা মিল বন্ধের উৎকন্ঠায় রয়েছেন।
জানা যায়, প্রায় ৪০ কোটি টাকা মূল্যের উৎপাদিত অবিক্রীত পাটজাত পণ্য মজুদ রয়েছে মিলের গুদাম ঘরে। স্থান সংকুলান না হওয়ায় উৎপাদিত ফিনিশিং বিভাগে যত্রতত্র পড়ে আছে এসব পণ্য। দীর্ঘদিন এসব পাটজাত পন্য পরে থাকায় অর্থ সংকটে পড়তে হচ্ছে মিল কর্তৃপক্ষকে।
বাংলাদেশ জুট মিলের পণ্য বিক্রি করে থাকে বিজেএমসি। উৎপাদিত পণ্য বিক্রি বাবদ বিজেএমসির কাছে ৭৩ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে বাংলাদেশ জুট মিল-কর্তৃপক্ষ। কিন্তু বিজেএমসি সময়মত টাকা পরিশোধ না করার কারণে শ্রমিকদের বেতন ভাতা দিতে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে মিল কর্তৃপক্ষকে। এদিকে, বেতন-ভাতা না পেয়ে এক প্রকার মানবেতর জীবন-যাপন করছে শতশত পরিবার।
মিলের শ্রমিকরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন বলেন, তারা সপ্তাহে মাত্র এক হাজার ৮শ থেকে দুই হাজার টাকা মজুরি পান। কিন্তু একাধিক সপ্তাহের মজুরি বকেয়া থাকায় তাদের আর্থিক কষ্টের মধ্য দিয়ে দিন কাটাতে হচ্ছে। অনেকে মজুরি না পেয়ে মিলে আসছেন না।
শ্রমিকরা আরও জানান, সময়মতো মজুরি না দেওয়ার কারণে কোন কোন দোকানদার শ্রমিকদের বাকি দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে খেয়ে না খেয়ে অতি কষ্টে পরিবার নিয়ে দিন কাটাতে হচ্ছে।
মিলের সিবিএ সভাপতি ইউসুফ আলী ও সাধারণ সম্পাদক আক্তারুজ্জামান বাংলাটিভি অনলাইনকে জানান, ৫২০ তাঁতের এই জুট মিলটিতে প্রায় সারে তিন হাজার শ্রমিক-কর্মচারী কর্মরত আছেন। পাট না থাকায় ৫২০টি তাঁতের মধ্যে চালু আছে মাত্র ১০০ তাঁত। এক সময় বাংলাদেশ জুট মিলটি দেশের অন্যতম লাভজনক জুট মিল ছিল। কিন্তু বিজেএমসি কর্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনা ও উদাসীনতার কারণে মিলটি আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে। বিজেএমসি টাকা না দেওয়ায় মিল কর্তৃপক্ষ চলতি সপ্তাহসহ ছয় সপ্তাহ যাবত শ্রমিকদের মজুরি ও চলতি মাসসহ দুই মাস ধরে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ভাতা দিতে পারছেন না।
অপরদিকে মিলের বিদ্যুৎ বিল প্রায় পৌনে ২ কোটি টাকা ও গ্যাস বিল ৬০ লাখ টাকা বকেয়া জমে গেছে। বকেয়া পরিশোধ না করার কারণে বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ বার বার বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার নোটিশ দিচ্ছে। ২০১১ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত গত ৬ বছর যাবত মিলের চাকরীচ্যুত শ্রমিক-কর্মচারীদের প্রভিডেন্ট ফান্ড ও গ্র্যাচ্যুইটির টাকাও পরিশোধ করতে পারছেন না মিল কর্তৃপক্ষ।
এ পর্যন্ত মিলে প্রভিডেন্ট ফান্ড ও গ্র্যাচ্যুইটির প্রায় ১৮ কোটি টাকা বকেয়া পড়ে আছে। এছাড়া বাংলাদেশ জুট মিলের কাছে পাট ব্যবসায়ীরা ৩২ কোটি টাকা পাওনা থাকায় এখন মিলে পাটও সরবরাহ করছে না পাট ব্যবসায়ীরা। পাট না থাকায় যে কোনো সময় মিলের উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাবে বলে জানান মিলের সিবিএ নেতারা।
মিলের তাঁত বিভাগের শ্রমিক জাহাঙ্গীর, কবির হোসেন, মিলের প্রবীণ শ্রমিক সিরাজ মোল্লা, ফিনিশিং বিভাগের রাশেদ মিয়া সাংবাদিকদের জানান, বাজারের সব কিছুর দাম ঊর্ধ্বগতির মধ্যেও ছয় সপ্তাহ ধরে আমাদের মজুরি বন্ধ। তারপরেও আমরা মিলের উৎপাদন অব্যাহত রেখেছি।
এদিকে মিলটির উৎপাদন বিভাগ থেকে জানায়, মিলের উৎপাদিত প্রায় ৪০ কোটি টাকার পাটজাত পণ্য মজুদ রয়েছে। এসব পণ্য সময়মতো বিক্রি করতে না পারায় আর্থিক সংকটে পড়েছে মিল কর্তৃপক্ষ। এ কারণে শ্রমিকদের মজুরি প্রদানে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের। ফলে বকেয়া মজুরির পরিমাণ বাড়ছে।
নিয়মিত মজুরি প্রদান করতে না পারায় দেখা দিচ্ছে শ্রমিক অসন্তোষ। তাছাড়া বিজেএমসি পাট কেনার টাকা না দেওয়ার কারণে উৎপাদন চালু রাখতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
এসব বিষয়ে বাংলাদেশ জুটমিলের মহাব্যবস্থাপক মো. গোলাম রব্বানী জানান, এতো বড় একটি কারখানা পরিচালনা করতে গিয়ে পাওনা দেনা থাকতেই পারে। পাট ব্যবসায়ীদের কিছু টাকা বকেয়া রয়েছে। এছাড়া বিজেএমসি উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করতে না পারার কারণে বেশী সমস্যা হয়েছে।
বাংলাটিভি/এসএম/এবি



