অন্যান্যবাংলাদেশ

নরসিংদীর স্বু-স্বাদু লটকন ॥ আয়ের প্রত্যাশা ১৬৬ কোটি টাকা

অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে এক সময়কার অপ্রচলিত ফল নরসিংদীর “লটকন”। এই অপ্রচলিত লটকনই আজ দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিশ্ব বাজারে রপ্তানী হওয়ায় অর্থনৈতিক গুরুত্ব বেড়েছে। আর অর্থনৈতিকভাবে সফলতা পাওয়ায় লটকন চাষে আগ্রহী কৃষকদের সংখ্যাও দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এবারের চলতি মৌসুমে ১ হাজার ৫ শত ৮০ হেক্টর জমিতে ২৩ হাজার ৭ শত মেট্রিক টন লকটনের ফলন পাওয়ার আশা করছেন নরসিংদী কৃষি বিভাগ। আর চলতি মৌসুমের উৎপাদিত লটকনের বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারন করা হয়েছে প্রায় ১ শত ৬৬ কোটি টাকা।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের নরসিংদীর উপ-পরিচালক শোভন কুমার ধর এ বিষয়ে নিশ্চিত করেছেন। স্থানীয় কৃষক ও কৃষি বিভাগ থেকে জানা যায়, আজ থেকে প্রায় ২৫/৩০ বছর পূর্বে প্রথমে জেলার বেলাবো উপজেলার লাখপুর নামে একটি গ্রামে ফল হিসেবে লটকনের আবাদ শুরু করেন কয়েকজন কৃষক। পরে বেলাব ও শিবপুর উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নের লালমাটির এলাকায় লটকন চাষের প্রসার শুরু হয়। দিনদিন মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে খাদ্য ও পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ লটকনের চাহিদা বাড়তে থাকায় বাজারেও এর ব্যাপক চাহিদা দেখা যায়। বাজারে ব্যাপক চাহিদা ও লাভজনক হওয়ার ফলে প্রতি বছরই লটকন চাষে কৃষকের সংখ্যা বাড়তে থাকে। বিশেষ করে বেলাব ও শিবপুর উপজেলায় বিগত ৩০ বছরে বাণিজ্যিকভাবে লটকনের প্রসার ঘটেছে। দুই উপজেলার প্রায় অধিকাংশ পরিবারের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি এখন এই অপ্রচলিত ফল লটকন। লটকন চাষ করে ভাগ্যের চাকা ঘুরানোর পাশাপাশি, বেকার সমস্যার সমাধানের পথ খুঁজে পেয়েছেন অনেকে।

কৃষি কর্মকর্তারা জানান, জেলার বেশকিছু এলাকাজুড়ে উচু লাল রংয়ের মাটি রয়েছে। আর এই লাল রংয়ের উঁচু মাটিতে প্রচুর পরিমাণ ক্যালসিয়াম ও খনিজ উপাদান বিদ্যমান থাকায় এখানকার মাটি ও আবহাওয়া লটকন চাষের জন্য খুবই উপযোগী। এছাড়া রায়পুরা, পলাশ ও মনোহরদী উপজেলার কিছু কিছু এলাকার মাটিও লটকন চাষের উপযোগী। এসকল উপজেলায়ও কমবেশী লটকনের আবাদ হয়ে আসছে। গাছের গোড়া থেকে শুরু করে মগডাল পর্যন্ত ছড়ায় ছড়ায় ঝুলে থাকে ফলন হয় এই লটকনের।

নরসিংদীর লটকন খেতে সুস্বাদু হওয়ায় সারা দেশেই চাহিদা বাড়ছে। ২০০৮ সাল থেকে দেশের চাহিদা মিটিয়ে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে রপ্তানী হচ্ছে নরসিংদীর এই সু-স্বাদু ফল লটকন। মৌসুমী এ ফলের বেচাকেনাকে ঘিরে জেলার ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের রায়পুরার মরজাল ও শিবপুর উপজেলা সদরে বসছে লটকনের বাজার। প্রতিদিন সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন জেলার পাইকারী ক্রেতারা এসে এসব বাজার থেকে কিনে নিয়ে যাচ্ছেন লটকন। পর্যায়ক্রমে হাত বদল হয়ে রাজধানী ঢাকা থেকে এসব লটকন রপ্তানী হচ্ছে বিদেশের বাজারেও। অনেকে সরাসরি জমি থেকে লটকন কিনে সরবরাহ করছেন দেশ বিদেশের বাজারে।

বেলাব উপজেলার লাখপুর গ্রামের নাজমুল হক জানান, কম খরচে অধিক লাভজনক ফসল হলো লটকন। লটকন বাগান শুরুর দিকে খরচ কিছুটা বেশি হলেও পরবর্তীতে বিঘা প্রতি ১০ হাজার টাকার বেশি খরচ হয়না। সেই তুলনায় লাভ অনেক বেশি হয়।

গ্রামের আরেক লটকন চাষী রাসেল ভূইয়া জানান, স্থানীয় বাজারে বিক্রি ছাড়াও লটকনের ফলন ধরার সাথে সাথে জমিতেই পাইকারী বিক্রি যাচ্ছে। পাইকারগণ বাগান কিনে দেশে বিদেশের বাজারে লটকন রপ্তানি করছেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের নরসিংদীর উপ-পরিচালক শোভন কুমার ধর এ প্রতিনিধিকে জানান, লটকন চাষ বৃদ্ধিতে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে চারা উৎপাদন করাসহ কৃষকদের প্রয়োজনীয়সহায়তা ও পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিশ্ব বাজারে  আজ রপ্তানী হওয়ায় লটকনের উপযুক্ত মূল্য পাচ্ছেন লটকন চাষে জড়িত কৃষকগণ।

চলতি বছরের ১হাজার ৫শত ৮০ হেক্টর জমিতে লটকনের আবাদ হয়েছে। প্রতি হেক্টরে কমবেশী ১৫ মেট্রিক টন ফলন হিসাবে লটকনের মোট উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২৩ হাজার ৭ শত মেট্রিক টন। পাইকারী বাজারে প্রতিকেজি লটকনের মূল্য ৭০ টাকা কেজি দরে বিক্রয় মূল্য হিসেবে আয় আসবে ১শত ৬৬ কোটি টাকা প্রায়।

বাংলা টিভি/শরীফ ইকবাল রাসেল

নরসিংদী প্রতিনিধি

সংশ্লিষ্ট খবর

Back to top button
Close