অন্যান্যবাংলাদেশ

ভাস্কর্যশিল্প আবহমান সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ

ভাস্কর্যশিল্প একটি দেশের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। নানা সময়ে আবিষ্কৃত নানা ভাস্কর্য থেকে বোঝা যায়, সুদূর অতীতকাল থেকেই পৃথিবীতে ভাস্কর্যশিল্পের বিকাশ ঘটেছিল। প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে ভাস্কর্য পৃথিবীর ইতিহাস ও সংস্কৃতির গৌরব বহন করে চলেছে।

আজও দেশে দেশে ভাস্কর্য তৈরি হচ্ছে নিপুণ সৃষ্টিশীলতায়। এর মাধ্যমে ফুটে উঠছে নিজ দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, কৃষ্টি-সংস্কৃতি। এ থেকে মুসলিম বিশ্বও পৃথক নয়। খোদ সৌদি আরব, ইন্দোনেশিয়া, মিশর, ইরান, ইরাকসহ প্রায় সকল মুসলিম দেশেই রয়েছে ভাস্কর্য।

বিশ্বের সবচেয়ে বেশি মুসলমান অধ্যুষিত দেশ ইন্দোনেশিয়ায় রয়েছে অসংখ্য ভাস্কর্য। এর মধ্যে বালিতে ভাস্কর্যের সংখ্যা বেশি। সেই দেশেরই উত্তর সুলাবেসি দ্বীপের খ্রিষ্টান অধ্যুষিত শহর মানাদোতে রয়েছে যিশু খ্রিষ্টের এমন একটি ভাস্কর্য, যেটি এশিয়ায় সবচেয়ে উঁচু। রয়েছে ইন্দোনেশিয়ার প্রথম প্রেসিডেন্ট সুকর্ণর বেশকিছু ভাস্কর্য।

ইন্দোনেশিয়ার পর বেশি মুসলিম বসবাসকারী দেশ পাকিস্তান। দেশটির জনসংখ্যার ৯৭ শতাংশই মুসলিম। ১৯৪৭ সালে ধর্মের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তানে নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও অব্যাহত রয়েছে ভাস্কর্য শিল্পের অগ্রযাত্রা। সেখানে রয়েছে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহসহ, রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক ব্যক্তিদের দৃষ্টিনন্দন ভাস্কর্য।

ইরানে রয়েছে কবি ফেরদৌসী, ওমর খৈয়াম, পারস্যের নেপোলিয়ন বলে খ্যাত নাদির শাহর মতো খ্যাতিমান ব্যক্তিদের ভাস্কর্য। এমনকি ইরানের রাজধানী তেহরানে দু’বছর পরপর অনুষ্ঠিত হয় সমকালীন ভাস্কর্য প্রদর্শনী ও প্রতিযোগিতা।

ইরাকেও আছে অনেক ভাস্কর্য। বাগদাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সামনেই আব্বাস ইবনে ফিরনাসের ভাস্কর্যটি নজর কাড়ে সবার। বাগদাদের পাশে আল-মনসুর শহরেও রয়েছে মনসুরের একটি বিশাল ভাস্কর্য। আছে অনেক সাধারণ সৈনিকের ভাস্কর্যও।

ইসলামি রাষ্ট্র মালয়েশিয়ায় সবচে বিখ্যাত ভাস্কর্য হলো ন্যাশনাল মনুমেন্ট। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে শহীদ হওয়া বীরদের স্মরণে এই ভাস্কর্যটি উন্মুক্ত করা হয় ১৯৬৬ সালে। এছাড়া পার্লামেন্ট হাউজের সামনে রয়েছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী টুংকু আবদুল রহমানের ভাস্কর্য।

আরেক সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম রাষ্ট্র তুরস্কেও রয়েছে দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট কামাল আতাতুর্কের অগণিত ভাস্কর্য। একেকটি দৃষ্টিনন্দন ভাস্কর্যে একেক রকমভাবে আতাতুর্ক এবং তুরস্কের ইতিহাস, ঐতিহ্য বিবৃত করা হয়েছে। এ ছাড়াও সেখানে রয়েছে অনেক উল্লেখযোগ্য ভাস্কর্য।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের উল্লেখযোগ্য ভাস্কর্য হলো, বুর্জ আল খলিফার বিপরীতে স্থাপিত আরবীয় যুগলের মূর্তি, দুবাইয়ের ওয়াফি অঞ্চলের প্রবেশপথে পাহারাদারের প্রতীক হিসেবে কুকুরের ভাস্কর্য ও ইবনে বতুতা মার্কেটে স্থাপিত ভাস্কর্য।

ইসলামের পুণ্যভূমি বলা হয় সৌদি আরবকে। প্রচন্ড-রক্ষণশীল মুসলিম দেশ সৌদি আরবের বাণিজ্যিক রাজধানী জেদ্দায় রয়েছে উটের দৃষ্টিনন্দন ভাস্কর্য। রাজধানী জেদ্দার উল্লেখযোগ্য ভাস্কর্যের মধ্যে আরও রয়েছে মুষ্টিবদ্ধ হাত, হাংরি হর্স, মানব চোখ, মরুর বুকে উটের ভাস্কর্য।

সুন্নি সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ কাতারেও দেখা যায় ব্যয়বহুল ও দৃষ্টিনন্দন সব ভাস্কর্য। তাজিকিস্থানের রাজধানী দুশানবেতে রয়েছে ইবনে সিনার একটি বিশাল ভাস্কর্য। মিশরেও রয়েছে অংসখ্য ভাস্কর্য। শুধু ইসলাম-পর্বই নয়, খ্রিস্টপূর্ব আড়াই হাজার অব্দের এসব মূর্তিও মিসরের মুসলমানরা ধ্বংস করেনি। বিশ্বের এমন অসংখ্য মুসলিম দেশে বিভিন্ন ভাস্কর্য থাকলেও সেসব দেশে সেগুলো নিয়ে কারও কোনো মাথাব্যথা নেই।

তবে সম্প্রতি রাজধানীর ধোলাইপাড়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর একটি ভাস্কর্যকে কেন্দ্র করে ইসলামে ভাস্কর্য নির্মাণ ‘নিষেধ’ দাবি করে এক সমাবেশে তা বন্ধের দাবি তোলেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হক। মামুনুলের বক্তব্যকে সমর্থন করে একই দাবী জানাচ্ছেন আরও কিছু ইসলামি সংগঠনের নেতারা।

এমন দাবি নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করেছেন সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী। তারা বলেছেন, ভাস্কর্য নিয়ে মনগড়া ব্যাখ্যা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও দেশের সংস্কৃতির প্রতি চ্যালেঞ্জ। বঙ্গবন্ধু এবং মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত ভাস্কর্য বাংলাদেশের সংস্কৃতিরই অংশ। কারো বিরোধিতায় এসব ভাস্কর্য নির্মাণ বন্ধ হবে না।

আসাদ রিয়েল, বাংলা টিভি

সংশ্লিষ্ট খবর

Back to top button