
বিশ্ব রক্তদাতা দিবস ১৪ জুন। দিনটি শুধু একটি নির্দিষ্ট দিনে রক্তদাতাদের স্মরণ করার বিষয় নয়—এটি রক্তদানের বিষয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ। বাংলাদেশে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ১০ লক্ষাধিক ইউনিট রক্তের প্রয়োজন হয়। দুর্ঘটনা, অপারেশন, জটিল প্রসব, ক্যানসার কিংবা ডায়ালাইসিস—সব ক্ষেত্রেই রক্তের প্রয়োজন পড়ে। কিন্তু সবচেয়ে নিয়মিতভাবে রক্ত দরকার পড়ে থ্যালাসেমিয়া রোগীদের। দেশে আনুমানিক ৭০ হাজারের বেশি মানুষ এই জেনেটিক রোগে আক্রান্ত, যাদের প্রতি মাসেই একাধিকবারও রক্ত নিতে হয়। এই বিশাল চাহিদা পূরণে অনেকাংশেই এগিয়ে এসেছে কিছু স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। ‘কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন’ তার মধ্যে অন্যতম। ২০০০ সাল থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত ১৭ লাখের বেশি ইউনিট রক্ত সংগ্রহ ও বিতরণ করেছে এ সঙ্ঘ। শুধু থ্যালাসেমিয়া রোগীদের জন্যেই তারা দিয়েছে প্রায় চার লাখ ইউনিট রক্ত। এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে একটি বড় শক্তি—তরুণ স্বেচ্ছাসেবকরা।
বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার বড় একটি অংশ তরুণ। যদি এই তরুণরাই নিয়মিত রক্তদান শুরু করেন, তাহলে দেশে আর রক্তের অভাবে কারো প্রাণ যাবে না। অথচ এখনো অনেক তরুণ ভুল ধারণা বা অজানা ভয়ের কারণে রক্তদানে অনাগ্রহী।চিকিৎসকরা বলছেন, ১৮ থেকে ৬০ বছর বয়সী যেকোনো সুস্থ মানুষ প্রতি তিন মাসে একবার নিরাপদে রক্ত দিতে পারেন। এতে শরীর দুর্বল হয় না বরং রক্তে নতুন কণিকা তৈরির মাধ্যমে দেহ আরও সতেজ হয়। এ প্রেক্ষাপটে দেশের রক্ত চাহিদা পূরণে তরুণরাই; যারা ১৮ পেরিয়েছেন তারাই রাখতে পারেন অনবদ্য ভূমিকা।
আমরা সবাই জানি, রক্তদানে একজনের জীবন বাঁচে। কিন্তু অনেকেই জানি না, রক্তদাতা নিজেও লাভবান হন। নিয়মিত রক্তদানে শরীরে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে, অতিরিক্ত আয়রনজনিত সমস্যা কমে এবং হৃদরোগের ঝুঁকি হ্রাস পায়। American Journal of Epidemiology-এর এক গবেষণায় বলা হয়েছে, নিয়মিত রক্তদাতারা হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কায় তুলনামূলকভাবে অনেকটাই নিরাপদ।
ভাবুন তো—মাত্র ১৫ মিনিট সময় নিয়ে আপনি কারও পুরো জীবন পাল্টে দিতে পারেন। একজন মায়ের সন্তানকে বাঁচাতে পারেন, একজন শিক্ষার্থীকে স্কুলে ফিরিয়ে দিতে পারেন, একজন রোগীকে আশার আলো দেখাতে পারেন। তরুণরাই পারে এই পরিবর্তনের সূচনা করতে। যদি তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসে, তাহলে আর কোনো রোগীকে রক্তের অভাবে মারা যেতে হবে না।
বিশ্ব রক্তদাতা দিবসে আসুন আমরা একসঙ্গে সুর মেলাই— রক্তদান শুধু মানবিক কাজ নয়, এটি একটি সচেতন সমাজ গঠনেরও অঙ্গীকার। তরুণদের হাত ধরেই গড়ে উঠুক এমনই এক মানবিক বাংলাদেশ, যেখানে তরুণদের দান করা প্রতিটি রক্তবিন্দুতেই জেগে উঠবে নতুন জীবন। স্বেচ্ছা রক্তদাতা সেইসব অগ্রগামী তরুণদের প্রতি শুভেচ্ছা।
আবু সাঈফ মোঃ মুনতাকিমুল বারী চৌধুরী
সহকারী প্রক্টর, সহযোগী অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।



