আন্তর্জাতিক

অস্ত্রহীন যুদ্ধের ময়দানে ইউরোপ, বাঁচাবে কে? চীন না আমেরিকা ?

বর্তমান বিশ্ব যেন এক ভয়াবহ যুদ্ধের মঞ্চ হয়ে উঠেছে,বড় বড় শক্তিগুলো স্বার্থ নিয়ে খেলছে নিষ্ঠুর খেলা যেখানে মানুষের স্বপ্ন কিংবা জীবনের কথা নেই। আছে শুধু শক্তি আর প্রভাব। এ থেকে মুক্ত নয় ইউরোপও। এক সময়ের উন্নতির প্রতীক ইউরোপ আজ হুমকির মুখে। ফ্রান্সের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট শার্ল দে গল একবার বলেছিলেন “ইউরোপের স্বাধীনতা শুধু সামরিক বা অর্থনৈতিক নয়,এটা মানসিক স্বাধীনতা, যা আমাদের নিজেদের পথ বেছে নিতে দেয়।” ইউরোপের সেই স্বাধীনতা আজ চ্যালেঞ্জের মুখে। তারা কি নিজেদের পথ বেছে নিতে পারবে?
গ্রীনল্যান্ড ইস্যুতে ইউরোপের ৮ দেশের উপর ট্রাম্পের ১০% শুল্ক আরোপের মধ্য দিয়ে এই বিভাজন আরো স্পষ্ট হয়ে উঠে। আমেরিকার উপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে ইউরোপ এখন চাইছে চীনের বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি স্থানান্তর। কারণ ইউরোপের অর্থনীতি চাপের মধ্যে আছে। জ্বালানি সংকট,ধীরগতির প্রবৃদ্ধি সব মিলিয়ে ইউরোপ বুঝতে পেরেছে,বাইরের সহযোগীতা ছাড়া একা উন্নয়ন করা প্রায় অসম্ভব। তখনই আসে চীনের প্রস্তাব। এ শুধু টাকার বিনিয়োগ নয় চীনের দেওয়া সুযোগ হলো নতুন জীবনের আশ্বাস। কারখানা,প্রযুক্তি,সবুজ শক্তি, প্রযুক্তি,নবায়নযোগ্য জ্বালানী ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অবকাঠামো। এসব দিয়ে চীন ছুঁয়ে দিতে চায় ইউরোপের হৃদয়।
কিন্তু এখাননেই ভয়ঙ্কর বাধা দাঁড়িয়ে আছে যুক্তরাষ্ট্র। তারা চায় ইউরোপ থাকবে তাদের নিয়ন্ত্রণে,চীনের হাত থেকে দূরে রাখবে নিজেদের প্রভাবক্ষেত্র। ইউরোপীয় কমিশনের সাবেক প্রেসিডেন্ট জোন ক্লড জুঙ্কার বলেছিলেন
“আমাদের সময় এসেছে নিজেদের ভরসা করার,কেউ আমাদের জন্য এই যুদ্ধে লড়বে না।” এখন ইউরোপের ভেতর চলছে এক ভয়ঙ্কর দ্বন্দ্ব। একদিকে আছে যুক্তরাষ্ট্রের চাপে থাকা মিত্র হওয়া,অন্যদিকে চীনের হাতে থাকা স্বপ্নের হাতছানি।
ইউরোপের সবচেয়ে বড় মিত্র যুক্তরাষ্ট্র চীনা প্রভাব তারা একেবারেই পছন্দ করে না। যুক্তরাষ্ট্র মনে করে,চীনা বিনিয়োগ মানেই ভবিষ্যতে কৌশলগত নির্ভরতা তৈরি হবে। আর নির্ভরতা মানেই ভবিষ্যতে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার। এ কারণেই ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক এতটাই টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যা আগে কখনো এত বেশি ছিল না। যুক্তরাষ্ট্র চায়
ইউরোপ চীনের সঙ্গে সম্পর্ক চুকিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল অনুসরণ করবে। কিন্তু ইউরোপ প্রশ্ন করছে “আমরা কি শুধুই মিত্র নাকি আমাদের নিজস্ব ভবিষ্যত নিজেদের ঠিক করার অধিকার আছে? এখানেই শুরু হয় এই গেম। এই গেমের নাম—কৌশলগত সমতা অর্জনের লড়াই।
ইউরোপ আছে দোটানায় তারা সরাসরি চীনের বিরোধিতাও করছে না আবার পুরোপুরি গ্রহণও করছে না। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রকে আশ্বস্ত করছে,আবার অন্যদিকে চীনের বিনিয়োগ আর প্রযুক্তি গ্রহণ করছে। সরকারিভাবে বলা হচ্ছে “ঝুঁকি কমানো হচ্ছে,বিচ্ছিন্ন করা নয়। কিন্তু পেছনে গড়ে উঠছে কারখানা,বাড়ছে যোগাযোগ,বিনিময় হচ্ছে প্রযুক্তি আর যুক্তরাষ্ট্রও শুল্ক আর আর্থিক চাপ সৃষ্টি করে প্রতিশোধ নিচ্ছে,শক্তিশালী করছে নিজেদের শিল্পকে।
ফলে এটা শুধুমাত্র রাজনীতি নয়,এটা একটা অর্থনৈতিক যুদ্ধ যে যুদ্ধে অস্ত্র নেই। চীন চায় ইউরোপকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব এলাকা থেকে সরিয়ে নিতে আর যুক্তরাষ্ট্র চায় ইউরোপকে
চীন মুক্ত সরবরাহ শৃঙ্খলায় রাখতে। আর ইউরোপ? তারা বাঁচার জন্য লড়াই করছে।
এই খেলায় কেউ পুরোপুরি জিততে পারছেনা। কিন্তু সবাই হারার ভয় পাচ্ছে। ইউরোপ কি নিজস্ব পথ বেছে নেবে নাকি বৃহত্তর শক্তির টানাপোড়েনে শুধু একটি যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবেই থেকে যাবে?

প্রতিবেদন: মাসুদ হাসান

সংশ্লিষ্ট খবর

Back to top button