আন্তর্জাতিক

ভারতে সাপের কামড়ে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু

ভারতে সর্পদংশন এক নিঃশব্দ মহামারির রূপ নিয়েছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতি বছর এ দেশে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ সাপের কামড়ে প্রাণ হারান, যা বিশ্বজুড়ে হওয়া মোট মৃত্যুর অর্ধেক। তবে ২০২০ সালের একটি গবেষণা বলছে, প্রকৃত সংখ্যাটি আরও বেশি হতে পারে—বিগত দুই দশকে ভারতে প্রায় ১২ লাখ মানুষ সাপে কামড়ে মারা গেছেন, যার বার্ষিক গড় প্রায় ৫৮ হাজার।

এই সংকটের মূলে রয়েছে চিকিৎসা ও পরিকাঠামোর এক বিশাল শূন্যতা। কৃষক দেবেন্দ্রর ঘটনাটি একটি জলজ্যান্ত উদাহরণ। তুঁত পাতা তুলতে গিয়ে সাপের কামড় খাওয়ার চার দিন পর যখন তিনি হাসপাতালে পৌঁছান, তখন চিকিৎসকদের কাছে তাঁর জীবন বাঁচানো সম্ভব হলেও একটি পা কেটে ফেলা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। দেবেন্দ্রর মতো ভাগ্য সবার হয় না; অনেকেই হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই ঢলে পড়েন মৃত্যুর কোলে।

গ্লোবাল স্নেকবাইট টাস্কফোর্স (জিএসটি)-এর একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ভারতের ৯৯ শতাংশ স্বাস্থ্যকর্মী জীবনরক্ষাকারী অ্যান্টিভেনেটাম প্রয়োগের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হন। পরিকাঠামোর অভাব, প্রতিষেধকের সংকট এবং চিকিৎসকদের অপর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ এই মৃত্যুকে আরও ত্বরান্বিত করছে। গবেষকরা দেখেছেন, চিকিৎসার এই বিলম্ব কেবল প্রাণই কেড়ে নেয় না, বরং হাজার হাজার মানুষকে পঙ্গুত্ব বা চিরস্থায়ী শারীরিক সমস্যার দিকে ঠেলে দেয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সাপে কামড়ানোর পর প্রতিটি সেকেন্ড অত্যন্ত মূল্যবান। বিষ দ্রুত রক্তে মিশে স্নায়ুতন্ত্রকে অকেজো করে দেয়, যার ফলে পক্ষাঘাত বা অঙ্গ বিকল হওয়ার মতো ঘটনা ঘটে। অথচ ভারতের গ্রামীণ অঞ্চলে অনুন্নত রাস্তাঘাট এবং অ্যাম্বুলেন্সের অভাবে সময়মতো চিকিৎসা পাওয়া এক প্রকার দুঃসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। গুজরাটে অ্যাম্বুলেন্স না পেয়ে একজন গর্ভবতী মহিলাকে যেভাবে কাপড়ের ঝোলায় করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, তা দেশের প্রান্তিক স্বাস্থ্যসেবার কঙ্কালসার চেহারাই তুলে ধরে।

আরেকটি বড় দুশ্চিন্তার বিষয় হলো অ্যান্টিভেনেটামের কার্যকারিতা। ভারতে বর্তমানে কেবল চারটি প্রধান বিষধর সাপের বিষের প্রতিষেধক পাওয়া যায়। কিন্তু এর বাইরেও এমন অনেক বিষধর সাপ রয়েছে, যাদের কামড়ে বর্তমানের সাধারণ অ্যান্টিভেনেটাম কোনো কাজ করে না। যোধপুর এইমসের গবেষণায় দেখা গেছে, অজ্ঞাত সাপের কামড়ে সাধারণ প্রতিষেধক দেওয়ার পর অর্ধেকের বেশি রোগী সুস্থ হন না।

২০১৭ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সর্পদংশনকে ‘উপেক্ষিত ক্রান্তীয় রোগ’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। ভারত সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে এই মৃত্যুহার অর্ধেকে নামিয়ে আনার জন্য জাতীয় কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। তবে ডক্টর যোগেশ জৈনের মতো জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সাপের কামড়কে এখনো কেবল ‘দরিদ্র মানুষের সমস্যা’ হিসেবে দেখা হয় বলেই এই বিষয়ে প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব রয়ে গেছে। গ্রামীণ ও আদিবাসী মানুষেরা যতক্ষণ না উন্নত চিকিৎসা ও পরিকাঠামোর সুযোগ পাচ্ছেন, ততক্ষণ এই প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যুর মিছিল থামানো কঠিন।

সংশ্লিষ্ট খবর

Back to top button