সংসদে অনগ্রসরদের কণ্ঠস্বর হতে চান রংপুরের হিজড়া প্রার্থী আনোয়ারা

চাকরির প্রস্তুতির জন্য কুড়িগ্রাম থেকে রংপুরে এসেছেন সাইমুল ইসলাম। রংপুর–৩ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী আনোয়ারা ইসলাম রানীর নির্বাচনি অবস্থান নিয়ে কৌতূহল থেকে তিনি রংপুর নগরের শাপলা চত্বরে এক ভ্রাম্যমাণ চায়ের দোকানে কথা বলেন ভোটার ইয়াকুব আলীর সঙ্গে। ইয়াকুব আলী জানান, “রানীর প্রচারণা খুব চোখে পড়ার মতো না হলেও ভোটারদের আলোচনায় তাঁর নাম নিয়মিতই আসছে।”
২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনে হিজড়া জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি হিসেবে আনোয়ারা ইসলাম রংপুর–৩ আসনে প্রার্থী হয়ে আলোচনায় আসেন। ওই নির্বাচনে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের ৮১ হাজার ভোট পেয়ে জয়ী হলেও ঈগল প্রতীক নিয়ে আনোয়ারা ইসলাম ২৩ হাজার ভোট পেয়ে তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী হন। পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় নির্বাচনী এলাকার বাইরেও অনেকেই তাঁকে অভিনন্দন জানান।
এবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে হরিণ প্রতীক নিয়ে আনোয়ারা ইসলামকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হচ্ছে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের, জামায়াতে ইসলামী ও ১১–দলীয় জোটের প্রার্থী মাহবুবুর রহমান এবং বিএনপির মহানগর সভাপতি সামসুজ্জামান সামুসহ মোট সাতজন প্রার্থীর সঙ্গে।
এ ছাড়া এই আসনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমিরুজ্জামান পিয়াল (হাতপাখা), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল–বাসদের আব্দুল কুদ্দুস (মই), বাসদ (মার্ক্সবাদী)-এর আনোয়ার হোসেন (কাঁচি) এবং বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী রিটা রহমান (সূর্যমুখী) নির্বাচনি প্রতিযোগিতায় রয়েছেন।
রংপুর সদর ও রংপুর সিটি করপোরেশনের ১০ থেকে ৩৩ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত রংপুর–৩ আসনে মোট ভোটার ৫ লাখ ৮ হাজার ২৪০ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৫২ হাজার ৩৭০ জন, নারী ২ লাখ ৫৫ হাজার ৮৪৯ জন এবং হিজড়া ভোটার রয়েছেন ৫ জন। এই আসনে ৫ হাজার ২৩০ জন ভোটার ইতিমধ্যে পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার জন্য নিবন্ধন করেছেন।
রংপুরেই জন্ম ও বেড়ে ওঠা আনোয়ারা ইসলামের। তাঁর বাবা মো. চাঁন মিয়া ছিলেন মোটরশ্রমিক এবং মা জুলেখা বেগম গৃহিণী। শাপলা চত্বরের কাছাকাছি নূরপুর এলাকায় তাঁর বাড়ি, সেখানেই রয়েছে নির্বাচনী কার্যালয়। বাড়ি থেকেই প্রচারণার সমন্বয় ও কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। বিকেলের পর তিনি বের হন ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি দেখা করতে।
বুধবার বিকেলে আনোয়ারা ইসলাম বলেন, জন্মের পর থেকেই লিঙ্গ পরিচয়ের কারণে তাঁকে বৈষম্যের শিকার হতে হয়েছে। তিনি জানান, পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি হয়ে সংসদে গিয়ে তাদের অধিকার আদায়ের কণ্ঠস্বর হতে চান। হিজড়া, বেদে, হরিজন, দলিত ও সাঁওতালসহ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করাই তাঁর মূল লক্ষ্য।
হলফনামা অনুযায়ী ৩৩ বছর বয়সী আনোয়ারা ইসলাম অষ্টম শ্রেণি পাস। তিনি জানান, ২০০৯ সালে রংপুরের হিজড়া জনগোষ্ঠীর শিক্ষা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যে ‘ন্যায় অধিকার তৃতীয় লিঙ্গ উন্নয়ন সংস্থা’ গড়ে তোলেন। তাঁর মতে, ২০১৩ সালে রাষ্ট্রীয়ভাবে হিজড়া জনগোষ্ঠীর স্বীকৃতি পাওয়া এই আন্দোলনের বড় সাফল্য।
পাশাপাশি কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে তিনি ‘রূপান্তর’ নামে একটি হস্তশিল্প উদ্যোগ শুরু করেন। বর্তমানে তাঁর সংগঠনের ২৩ জন সদস্য ভিক্ষাবৃত্তি ছেড়ে নিয়মিত কর্মসংস্থানে যুক্ত হয়েছেন। ফাস্টফুডের দোকান চালু করা হয়েছে এবং ৩২ জনকে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করানো হয়েছে। আনোয়ারা ইসলাম বলেন, “আমার ব্যক্তিগত উদ্যোগ সীমিত। টেকসই পরিবর্তন আনতে হলে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ভেতরে যেতে হবে।”
আনোয়ারা ইসলাম বলেন, বেদে, হরিজন, দলিত, সাঁওতালসহ অনেক প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষ এখনো বাসস্থান, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত। এসব মানুষের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই তিনি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন।
নির্বাচনী এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, ভোটারদের মধ্যে তাঁকে নিয়ে আগ্রহ রয়েছে। তবে কেউ কেউ মনে করেন, আগের নির্বাচনে জাতীয় পার্টির সঙ্গে আসন সমঝোতার কারণে আওয়ামী লীগের কিছু অসন্তুষ্ট ভোটার তাঁকে ভোট দিয়েছিলেন। এবার পরিস্থিতি ভিন্ন—জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস মিলছে।
তবু ফলাফল যাই হোক, আনোয়ারা ইসলামের প্রার্থী হওয়াকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। রংপুর স্বর্ণ নারী অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান মঞ্জুশ্রী সাহা বলেন, “এটি আশাব্যঞ্জক উদ্যোগ। শুধু তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ নয়, সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও তাঁর প্রতি আগ্রহ ও সমর্থন দেখা যাচ্ছে।”



