হঠাৎ কেন আলোচনায় ‘আজাদি, ইনকিলাবের’ মতো কিছু শব্দ

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজপথে শিক্ষার্থীদের মুখে যেসব স্লোগান বেশি শোনা গিয়েছিল, তার মধ্যে ছিল “ইনকিলাব জিন্দাবাদ”, “আজাদি” ও “ইনসাফ”। সময়ের ব্যবধানে আন্দোলন থেমে গেলেও সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিসরে এসব শব্দ আবারও আলোচনায় উঠে এসেছে।
কেউ কেউ বক্তৃতা ও সমাবেশে সচেতনভাবে এসব শব্দ ব্যবহার করছেন—এমন অভিযোগও উঠেছে। বিতর্ক এতটাই বিস্তৃত হয়েছে যে সরকারের মন্ত্রী থেকে শুরু করে শীর্ষ রাজনৈতিক নেতারাও এ বিষয়ে মত দিচ্ছেন। একজন মন্ত্রী মন্তব্য করেন, এসব শব্দের সঙ্গে বাংলা ভাষার সম্পর্ক নেই।
তবে ভাষাবিদদের মতে, “ইনকিলাব”, “ইনসাফ”, “আজাদি”, “মজলুম”, “বয়ান” বা “বন্দোবস্ত”—এ ধরনের শব্দ বাংলা ভাষার জন্য হুমকি নয়। বরং রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ব্যবহারের কারণেই এগুলো এখন বেশি দৃশ্যমান। দৈনন্দিন কথাবার্তায় এ ধরনের শব্দ সাধারণত কম ব্যবহৃত হয় বলেই তা নজরে আসে বেশি।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বহু বিদেশি শব্দ একীভূত হয়ে গেছে—যেমন আওয়ামী লীগ, কমিউনিস্ট, ইউনিয়ন। এমনকি “ইত্তেফাক” বা “ইনকিলাব” শব্দ দিয়েও জাতীয় পত্রিকার নামকরণ হয়েছে। ফলে শব্দের উৎস ভিন্ন হলেও তা সময়ের সঙ্গে ভাষায় মিশে যাওয়ার নজির নতুন নয়।
বিশেষ করে “ইনকিলাব” শব্দটি নতুন করে আলোচনায় আসে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর গড়ে ওঠা “ইনকিলাব মঞ্চ” নামের একটি প্ল্যাটফর্মের কারণে। এর প্রতিষ্ঠাতা ওসমান হাদি নির্বাচনী প্রচারের সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকায় জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-র আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে নেতাদের বক্তব্যের শেষেও “ইনকিলাব জিন্দাবাদ” স্লোগান শোনা যায়। উল্লেখ্য, “ইনকিলাব জিন্দাবাদ” স্লোগানটি উপমহাদেশের বাম রাজনীতিতেও ব্যবহৃত হয়ে থাকে, যার অর্থ ‘বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক’।
নতুন করে বিতর্কের সূত্রপাত হয় যখন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু ভাষা শহীদ দিবসের এক সভায় বলেন, “বাংলাকে ধারণ করতে হলে ইনকিলাব জিন্দাবাদ চলবে না।” তার এই মন্তব্যের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়।
নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ সরাসরি “ইনকিলাব জিন্দাবাদ” লিখে প্রতিক্রিয়া জানান। সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ প্রশ্ন তোলেন, “ইনকিলাব জিন্দাবাদ শুনলে ব্লিডিং হয়?” ছাত্রনেতা নাসিরউদ্দিন পাটোয়ারি-ও সামাজিক মাধ্যমে মন্তব্য করেন।
এ ছাড়া জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী-র আমির শফিকুর রহমান লেখেন, “ইনশাআল্লাহ আগামীর বাংলাদেশ ইনসাফের বাংলাদেশ, ইনকিলাব জিন্দাবাদ।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক তারিক মনজুর মনে করেন, এসব শব্দ কোনো বিকৃতি বা হুমকি নয়। ভাষা স্বভাবতই ধার করে, বদলায়, রূপান্তরিত হয়। তবে শব্দের ব্যবহার যদি কেবল নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বা ধর্মীয় পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, তাহলে তা বিভাজনের কারণ হতে পারে।
তার মতে, বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত সব শব্দই একসময় না একসময় বাইরের উৎস থেকে এসেছে এবং ধ্বনি ও গঠনগত পরিবর্তনের মাধ্যমে বাংলা ভাষার অংশে পরিণত হয়েছে। ফলে ভাষার স্বাভাবিক বিবর্তনকে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু বানানোর প্রয়োজন নেই।
তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা



