বাংলাদেশ

কিডনি দিয়ে স্ত্রীর প্রাণ বাঁচালেন স্বামী, ভালোবাসার বিরল দৃষ্টান্ত

ভালোবাসা শুধু কথায় বা অনুভূতিতে সীমাবদ্ধ থাকে না—প্রয়োজনে তা ত্যাগের মাধ্যমেও প্রকাশ পায়। শরীয়তপুরের মো. জসিম উদ্দিন সেই বাস্তব উদাহরণ তৈরি করেছেন। দীর্ঘদিনের জীবনসঙ্গী মিনারা বেগমের জীবন বাঁচাতে নিজের একটি কিডনি দান করে তিনি দাম্পত্য ভালোবাসার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

ঘটনাটি এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। অনেকেই এটিকে দায়িত্ববোধ, আত্মত্যাগ এবং প্রকৃত ভালোবাসার উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে দেখছেন।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, প্রায় দুই বছর আগে উচ্চ রক্তচাপসহ নানা শারীরিক জটিলতায় আক্রান্ত হন ৩২ বছর বয়সী মিনারা বেগম। চিকিৎসা পরীক্ষায় ধরা পড়ে, তার দুটি কিডনিই বিকল হয়ে গেছে। পাশাপাশি পেটে একটি টিউমারও শনাক্ত হয়। এতে পরিবারে নেমে আসে চরম দুশ্চিন্তা।

পরে তাকে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং টিউমারের চিকিৎসা সম্পন্ন হয়। কিন্তু আর্থিক সংকটের কারণে তখন কিডনি প্রতিস্থাপন করা সম্ভব হয়নি। সময়ের সঙ্গে তার শারীরিক অবস্থা আরও খারাপ হতে থাকলে উপযুক্ত কিডনি দাতার খোঁজ শুরু হয়। এক পর্যায়ে তার মা কিডনি দিতে চাইলেও শারীরিক জটিলতার কারণে তা সম্ভব হয়নি।

এই কঠিন সময়ে স্বামী জসিম উদ্দিন এগিয়ে আসেন। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে গত ৫ মার্চ ঢাকার শ্যামলীর একটি বিশেষায়িত হাসপাতালে সফলভাবে কিডনি প্রতিস্থাপন সম্পন্ন হয়। বর্তমানে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছেন মিনারা বেগম। স্বামী ও সন্তানকে নিয়ে ঢাকায় থেকে চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা করছেন তিনি।

জানা গেছে, শরীয়তপুরের গোসাইরহাট উপজেলার কুচাইপট্টি ইউনিয়নের বসকাঠি গ্রামের বাসিন্দা এই দম্পতির বিয়ে হয় ২০০৭ সালে। দাম্পত্য জীবনের কিছুদিন পর জন্ম নেয় তাদের একমাত্র সন্তান তামিম আল মারুফ, যিনি বর্তমানে নবম শ্রেণিতে পড়াশোনা করছেন।

২০২৪ সালের শুরুতে অসুস্থতা ধরা পড়ার পর থেকে মিনারার চিকিৎসা চলছিল বিভিন্ন হাসপাতালে। কিন্তু কিডনি জটিলতা ক্রমেই গুরুতর হয়ে ওঠে। এমন পরিস্থিতিতে স্বামীর এই আত্মত্যাগ শুধু একটি জীবনই বাঁচায়নি, বরং ভালোবাসার গভীরতাকেও নতুনভাবে তুলে ধরেছে।

মিনারা বেগম জানান, স্বামীর সীমিত আয় ও সন্তানের পড়াশোনার কারণে পরিস্থিতি সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছিল। তার মা কিডনি দিতে চাইলেও তা সম্ভব হয়নি। পরে স্বামী নিজেই এগিয়ে আসেন, যদিও তিনি শুরুতে অনেকবার নিষেধ করেছিলেন। এখন আল্লাহর রহমতে দুজনই ভালো আছেন।

অন্যদিকে জসিম উদ্দিন বলেন, স্ত্রীর এমন অবস্থায় তিনি দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেন—বাঁচলে একসঙ্গে বাঁচবেন, না হলে একসঙ্গেই মৃত্যুকে গ্রহণ করবেন। চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী নিজের ইচ্ছাতেই কিডনি দান করেন তিনি। এটি তার সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত ছিল বলে তিনি জানান।

স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিএম নাসির উদ্দিন স্বপন বলেন, স্ত্রীর জীবন বাঁচাতে নিজের কিডনি দান করে জসিম উদ্দিন বিরল এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তিনি এই দম্পতির সুস্থতা ও সুখী জীবনের জন্য দোয়া কামনা করেন।

সংশ্লিষ্ট খবর

Back to top button