‘আমগাছটি না থাকলে স্রোতে ভেসে গিয়ে মারা যেতাম’

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: নেপালে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার স্রোতে ভেসে যাওয়ার পর একটি আমগাছ আঁকড়ে ধরে অলৌকিকভাবে প্রাণে বেঁচেছেন ২৪ বছর বয়সি শ্রমিক বিবেক কুমাল। তার ভাষ্য, ওই গাছটি না থাকলে প্রবল স্রোতে ভেসে গিয়ে তার মৃত্যু নিশ্চিত ছিল।
বুধবার (২৬ আগস্ট) নেপালের বিদুর এলাকায় একটি নতুন নির্মিত বাড়ির বাইরে টয়লেটের গর্ত খননের কাজ করছিলেন কুমাল। প্রায় পাঁচ ফুট গভীর গর্তে কাজ করার সময় হঠাৎ পাহাড়ি ঢলের বিকট শব্দ শুনতে পান তিনি। তার চার সহকর্মী দ্রুত গর্ত থেকে উঠে নিরাপদ স্থানে সরে যেতে বলেন।
গর্ত থেকে বের হয়ে দৌড় শুরু করার কিছুক্ষণের মধ্যেই কাদা, পাথর ও পানির বিশাল স্রোত তার দিকে ধেয়ে আসে। মুহূর্তের মধ্যে সেই স্রোতে ভেসে যান কুমাল। পরে ধ্বংসাবশেষের সঙ্গে ভাসতে ভাসতে একটি আমগাছের কাছে গিয়ে আটকে পড়েন তিনি। প্রাণ বাঁচাতে গাছটি শক্ত করে আঁকড়ে ধরে থাকেন।
পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাকে উদ্ধার করে। বন্যার প্রবল স্রোত ও বড় একটি পাথরের আঘাতে তার ডান পায়ে গুরুতর চোট লাগে। বর্তমানে কাঠমান্ডুর ন্যাশনাল ট্রমা সেন্টারে চিকিৎসাধীন রয়েছেন তিনি।
বন্যায় নিহত অন্তত ১৬২
চীনের তিব্বত সীমান্তবর্তী নেপালের রাসুয়া জেলা ও আশপাশের এলাকায় আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে অন্তত ১৬২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এখনও প্রায় চার শতাধিক মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন, যাদের মধ্যে বিদেশি নাগরিকও রয়েছেন।
প্রবল পানির স্রোতে বহু ঘরবাড়ি, যানবাহন ও অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে। নিরাপত্তা ক্যামেরার ফুটেজে দেখা গেছে, পাহাড়ি ঢল ও কাদার বিশাল স্রোত নেমে আসার আগে স্থানীয়রা দ্রুত নিরাপদ স্থানে ছুটে যাচ্ছেন। এরপর মুহূর্তের মধ্যেই বহু ভবন ও গাড়ি স্রোতে ভেসে যায়।
প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, নেপাল-তিব্বত সীমান্তের একটি নদীতে বিপুল পরিমাণ কাদা ও পাথর ধসে পড়ার পর এই ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। তবে দুর্যোগটির সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
জার্মান রিসার্চ সেন্টার ফর জিওসায়েন্সেসের তথ্য অনুযায়ী, নিরাপত্তা ক্যামেরায় ধারণ করা ঘটনার প্রায় সাত মিনিট আগে ওই এলাকায় ৪ দশমিক ৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্প হয়েছিল।
স্কুল থেকে ফেরার পথে স্রোতে ভেসে যায় শিশু
বন্যায় আহত হয়ে বিবেক কুমালের সঙ্গে আরও তিনজন হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। রাজধানী কাঠমান্ডু ও রাসুয়া জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে এখন পর্যন্ত ১১৪ জনের বেশি আহতকে উদ্ধার করে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
আহতদের মধ্যে রয়েছে ১১ বছর বয়সি রিহানা লামিছানে। বন্যার সময় সে স্কুলে ছিল। পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠলে স্কুল ছুটি দিয়ে শিক্ষার্থীদের বাড়ি ফিরে যেতে বলা হয়। বাড়ি ফেরার পথে নদী পার হওয়ার সময় হঠাৎ প্রবল স্রোতে পড়ে যায় রিহানা।
স্রোতের ধাক্কায় তার বুক ও পায়ে আঘাত লাগে। তবে প্রাণে বেঁচে যাওয়ায় স্বস্তি প্রকাশ করেছে শিশুটি। নিজের বন্ধুদের পরিণতি সম্পর্কে এখনো কিছু জানে না বলেও জানিয়েছে সে।
মেয়ে নিখোঁজ হওয়ার খবর পেয়ে তাকে খুঁজতে বের হন রিহানার মা রিতা। পরে মেয়েকে নিরাপদে ফিরে পেয়ে স্বস্তি প্রকাশ করেন তিনি।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের উচ্চ ঝুঁকিতে নেপাল
পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির কারণে বর্ষা মৌসুমে নেপালে প্রায়ই বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনা ঘটে। একই সঙ্গে দেশটি ভূমিকম্পসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিতেও রয়েছে।
বিবেক কুমাল নিজেও ২০১৫ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা পেয়েছিলেন। ওই ভূমিকম্পে নেপালে প্রায় ৯ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল।
এবারের আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে আবারও বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে দেশটি। নিখোঁজদের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে।



