‘ছাইটুকু দেশে আনতে পারলেও কবর দিতে পারতাম’

বাংলা টিভি ডেস্ক: দক্ষিণ আফ্রিকায় অগ্নিকাণ্ডে ছয় বাংলাদেশির মৃত্যুর ঘটনায় নারায়ণগঞ্জের আলীরটেক ও বক্তাবলী ইউনিয়নের তিন গ্রামে এখনো চলছে শোকের মাতম। স্বজনদের কান্না আর আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা।
নিহতদের স্বজনদের বরাতে জানা গেছে, দক্ষিণ আফ্রিকার কুইন্সটাউনের শ্রম এলাকায় একটি সুপারশপে মঙ্গলবার ভোরে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। ওই সময় দোকানের ভেতরে থাকা বাংলাদেশিরা আগুন থেকে বের হতে না পারায় দগ্ধ হন। ঘটনাস্থলেই ছয়জনের মৃত্যু হয়।
বুধবার নিহতদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিটি বাড়ির আঙিনায় স্বজন ও প্রতিবেশীদের ভিড়। কেউ স্বজনদের সান্ত্বনা দিচ্ছেন, আবার কেউ নীরবে বসে আছেন। তবে প্রিয়জন হারানোর শোক কোনোভাবেই কাটছে না পরিবারগুলোর।
আলীরটেক ইউনিয়নের মধ্য ক্রোকেরচর গ্রামের আপন আহমেদের (২২) মৃত্যুর খবরে তার পরিবারে নেমে এসেছে গভীর শোক। ছেলের মৃত্যুর খবর পেয়ে মা আঁখি বেগম বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন। পরিবারের সদস্যরা জানান, চার বছর আগে জীবিকার সন্ধানে দক্ষিণ আফ্রিকায় গিয়েছিলেন আপন। নিজের বাড়ি নির্মাণ এবং বাবা-মাকে নিয়ে থাকার স্বপ্ন ছিল তার, কিন্তু তা আর পূরণ হলো না।
একই অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছেন আলীরটেকের ফাহিম, নূর মোহাম্মদ, তৈলখিরারচরের ফয়সাল, বক্তাবলী ইউনিয়নের শাহীন এবং মুন্সীগঞ্জের রাজ্জাক।
শাহিনের পরিবার জানায়, প্রায় নয় বছর ধরে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকায় ছিলেন। সম্প্রতি সেখানকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে দেশে ফেরার ইচ্ছার কথাও বলেছিলেন তিনি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর ফেরা হলো না।
নূর মোহাম্মদের (৫৫) পরিবারও শোকে ভেঙে পড়েছে। ২০১৯ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় যাওয়া নূর মোহাম্মদের আয়ে পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ খরচ চলত। তার দুই মেয়ের বিয়ে হয়েছে এবং একমাত্র ছেলে সিয়াম এবার এইচএসসি পরীক্ষার্থী।
স্থানীয়রা জানান, নিহতদের বেশিরভাগই পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী ছিলেন। তাদের মৃত্যুতে পরিবারগুলো আর্থিক ও মানসিকভাবে বড় সংকটে পড়েছে।
স্বজনরা নিহতদের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, দক্ষিণ আফ্রিকায় বাংলাদেশ হাইকমিশন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা কামনা করেছেন। তারা জানান, মরদেহ দেশে আনার প্রক্রিয়ার জন্য সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে।
এদিকে দক্ষিণ আফ্রিকায় থাকা বাংলাদেশি কমিউনিটির সদস্যরাও নিহতদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছেন। অগ্নিকাণ্ডের কারণ খুঁজে বের করতে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে।
অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত সুপারশপের মালিক নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার আলীরটেক ইউনিয়নের ইউপি সদস্য রওশন আলী জানান, দোকানের আবাসিক কক্ষে সাতজন ঘুমিয়ে ছিলেন। গভীর রাতে আগুন ছড়িয়ে পড়লে ছয়জন মারা যান এবং একজন আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। আগুনের কারণ এখনো নিশ্চিত নয়; বিষয়টি তদন্ত করছে স্থানীয় পুলিশ।
নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক রায়হান কবির জানান, প্রবাসী কল্যাণ শাখার কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। দূতাবাস থেকে আনুষ্ঠানিক তথ্য পাওয়ার পর নিহতদের পরিবারের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।



