বাংলাদেশ

প্রথম বিয়ের কথা জেনে যাওয়ায় দ্বিতীয় স্ত্রীকে হত্যা, মরদেহ ফেলা হয় খালে

বাংলা টিভি ডেস্ক: দ্বিতীয় বিয়ের সময় নিজের প্রথম বিয়ের কথা গোপন করেছিলেন রাজা মিয়া ওরফে রাজু। পরে বিষয়টি জানাজানি হলে স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌসের (২৮) সঙ্গে তার দাম্পত্য কলহ শুরু হয়। এর জের ধরে স্ত্রীকে হত্যার পরিকল্পনা করেন তিনি বলে জানিয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। বেড়াতে যাওয়ার কথা বলে নৌকায় তুলে সহযোগীদের নিয়ে জান্নাতুলকে শ্বাসরোধে হত্যার পর মরদেহ বস্তাবন্দি করে খালে ফেলে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে স্বামী ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে।

ঘটনার প্রায় আড়াই মাস পর হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্‌ঘাটনের কথা জানিয়েছে পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রো ইউনিট। বুধবার (১৪ অক্টোবর) সংস্থাটির পুলিশ সুপার এম কে এইচ জাহাঙ্গীর হোসেন এ তথ্য জানান।

পিবিআই সূত্রে জানা যায়, জান্নাতুল ফেরদৌস চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার শিলকূপ ইউনিয়নের বাসিন্দা ছিলেন। তিনি একটি জুতার কারখানায় কাজ করতেন। সাত বছর বয়সী মেয়েকে নিয়ে চট্টগ্রামের চান্দগাঁও থানার বাহির সিগন্যাল এলাকার ব্যাপারীপাড়ায় ভাড়া বাসায় থাকতেন। প্রথম স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পর ২০২৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর রাজা মিয়াকে বিয়ে করেন তিনি। বিয়ের সময় রাজা নিজেকে অবিবাহিত পরিচয় দিলেও পরে জান্নাতুল জানতে পারেন, তার আগের স্ত্রী রয়েছেন। এ নিয়ে দুজনের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, স্ত্রীকে হত্যার পরিকল্পনা নিয়ে রাজা মিয়া তার পূর্বপরিচিত মো. মুসলিম উদ্দিনের সঙ্গে আলোচনা করেন। পরে তারা কালুরঘাট সেতু এলাকার এক কবিরাজের মাধ্যমে ঝাড়ফুঁক ও তান্ত্রিক পদ্ধতির আশ্রয় নেন। এতে কোনো সমাধান না হওয়ায় জান্নাতুলকে হত্যার পরিকল্পনা করেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গত ২৮ জুলাই সন্ধ্যা ৬টার দিকে বেড়ানোর কথা বলে জান্নাতুলকে কর্ণফুলী নদীর অপর পাড়ের ব্রিজঘাট এলাকায় নিয়ে যান রাজা। সেখানে আগে থেকেই মুসলিম উদ্দিন, রাজা মিয়ার প্রথম স্ত্রীর ভাই শুকুর আহম্মদ এবং অজ্ঞাতপরিচয় আরেক ব্যক্তি সাম্পান নৌকা নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন। পরে জান্নাতুলকে নিয়ে তারা নৌকায় ওঠেন। নৌকাটি কর্ণফুলী সেতুর নিচ দিয়ে শিকলবাহা খালে প্রবেশ করে।

পিবিআইয়ের তদন্ত অনুযায়ী, রাত ৮টার পর নৌকার মধ্যে রাজা মিয়ার সঙ্গে জান্নাতুলের কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে তিনি স্ত্রীর মুঠোফোন কেড়ে নিয়ে খালে ফেলে দেন। এরপর জান্নাতুলের মুখ চেপে ধরেন। এ সময় এক সহযোগী নৌকায় রাখা ব্যাগ থেকে রশি ও বস্তা বের করেন। পরে রশি দিয়ে গলায় পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করা হলে জান্নাতুলের মৃত্যু হয় বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর তার হাত-পা বেঁধে বস্তায় ভরে কর্ণফুলী থানার কালারপোল এলাকায় এস আলম কোল্ড রোল্ড স্টিলস লিমিটেডের পেছনে শিকলবাহা খালে ফেলে দেওয়া হয় বলে জানিয়েছে পিবিআই।

হত্যাকাণ্ডের পর অভিযুক্তরা নৌকাটি নিয়ে ব্রিজঘাট এলাকায় ফিরে যান এবং পরে আত্মগোপনে চলে যান বলে তদন্তে উঠে এসেছে। এর কয়েক দিন পর, ২ আগস্ট দুপুর ১২টার দিকে শিকলবাহা বিদ্যুৎকেন্দ্রের লঞ্চঘাটসংলগ্ন খালে ভাসমান অবস্থায় এক নারীর মরদেহ উদ্ধার করে সদরঘাট নৌ-পুলিশ। মরদেহটি বস্তাবন্দি ছিল এবং হাত-পা বাঁধা ছিল। পরে পরিবারের সদস্যরা সেটি নিখোঁজ জান্নাতুলের বলে শনাক্ত করেন।

এ ঘটনায় জান্নাতুলের মা ছায়রা খাতুন বাদী হয়ে রাজা মিয়া ওরফে রাজুসহ অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কর্ণফুলী থানায় হত্যা মামলা করেন।

গত ৬ অক্টোবর মামলাটির তদন্তভার গ্রহণ করে পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রো ইউনিট। পুলিশ সুপারের তত্ত্বাবধানে তদন্তকারী কর্মকর্তা উপপরিদর্শক আব্দুর রহিম তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনা করেন। এর ধারাবাহিকতায় গত ১৩ অক্টোবর টেকনাফ থানা এলাকায় আত্মগোপনে থাকা মো. মুসলিম উদ্দিনকে (৩৯) গ্রেপ্তার করা হয়। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে শুকুর আহম্মদকেও (২৪) গ্রেপ্তার করা হয়। এ ছাড়া হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত সাম্পান নৌকাটি উদ্ধার করে জব্দ করা হয়েছে।

পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রোর পুলিশ সুপার এম কে এইচ জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, ১৪ অক্টোবর মুসলিম উদ্দিন আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। সেখানে তিনি নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করে ঘটনার বিবরণ দিয়েছেন বলে জানান তিনি। গ্রেপ্তার শুকুর আহম্মদকে পুলিশ হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। মামলাটির তদন্ত এখনো চলমান রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট খবর

Back to top button