গ্রামবাসীর চাঁদায় কেনা হলো খেলার মাঠের জমি, গ্রামজুড়ে উৎসব

বাংলা টিভি ডেস্ক: একটি স্থায়ী খেলার মাঠের স্বপ্ন পূরণে অসাধারণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার বাবুপুর গ্রামের বাসিন্দারা। সরকারি কিংবা বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানের সহায়তা ছাড়াই নিজেদের অর্থে জমি কিনে খেলার মাঠ তৈরি করার উদ্যোগ নিয়েছেন তারা। ধনী-গরিব নির্বিশেষে গ্রামের মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় কেনা হয়েছে ৬০ শতাংশ জমি।
উদ্যোক্তা খোরশেদ আলম জানান, গত ৮ সেপ্টেম্বর এ বিষয়ে গ্রামবাসীকে নিয়ে একটি মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়। সভায় উপস্থিত সবাই খেলার মাঠের জন্য জমি কেনার সিদ্ধান্তে একমত হন। পাশাপাশি নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী আর্থিক সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।
তিনি জানান, এ উদ্যোগে ইকবাল মাহমুদ, আজাহার শিকদার, সেলিম আল মামুন, মিজানুর রহমান, মজনু শিকদার, শফিকুল ইসলাম ও শুভ প্রামাণিকসহ গ্রামের বেশ কয়েকজন উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। তবে শুধু সচ্ছল ব্যক্তিরাই নন, সাধারণ মানুষও নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী এগিয়ে আসেন। কেউ ২০০ টাকা, কেউ ৫০০ বা এক হাজার টাকা দিয়েছেন। আবার কেউ দুই হাজার, পাঁচ হাজার কিংবা ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত সহযোগিতা করেছেন।
গ্রামবাসীর সংগৃহীত অর্থ দিয়ে ইকবাল হোসেন সুজনের কাছ থেকে ৬০ শতাংশ জমি কেনা হয়। প্রতি শতাংশের মূল্য নির্ধারণ করা হয় ৫২ হাজার টাকা। জমির মালিকও নিজের পক্ষ থেকে এক শতাংশ জমি দান করেন। বৃহস্পতিবার আনুষ্ঠানিকভাবে জমিটি গ্রামবাসীর কাছে হস্তান্তর করা হয়।
জমি বুঝে নেওয়ার দিন পুরো গ্রামে উৎসবের আবহ তৈরি হয়। বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে আনন্দ-উল্লাসের মধ্য দিয়ে জমিতে উপস্থিত হন গ্রামের বাসিন্দারা। সেখানে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। উদ্যোগের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের পাশাপাশি গ্রামের প্রবীণদেরও ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে নেন তরুণেরা। দিনভর চলে আনন্দ আয়োজন।
উদ্যোগের অন্যতম সংগঠক খোরশেদ আলম জানান, আপাতত ৬০ শতাংশ জমি কেনা হয়েছে। এর পাশের আরও ৬০ শতাংশ জমি কেনার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। সব মিলিয়ে ১২০ শতাংশ জমি পাওয়া গেলে সেখানে একটি মানসম্মত খেলার মাঠ গড়ে তোলা সম্ভব হবে। এই মাঠকে কেন্দ্র করে ভবিষ্যতে গ্রামের খেলাধুলার পরিবেশ আরও সমৃদ্ধ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
নতুন মাঠ পেয়ে উচ্ছ্বসিত গ্রামের কিশোরেরাও। হাবিবুল্লাহ সালমান জানায়, আগে ধান কাটার পর ফাঁকা জমিতে খেলাধুলা করা গেলেও ফসলের আবাদ শুরু হলে আর খেলার সুযোগ থাকত না। এখন সারা বছর খেলার জায়গা পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় তারা আনন্দিত।
আরেক কিশোর রাব্বী জোহা জানায়, বাড়ির উঠানে ফুটবল খেলতে গিয়ে অনেক সময় বলের আঘাতে ঘরের বেড়া ক্ষতিগ্রস্ত হতো। এ কারণে পরিবারের সদস্যদের বকাঝকাও শুনতে হতো। নতুন মাঠ হওয়ায় এখন নিশ্চিন্তে খেলাধুলা করতে পারবে তারা।
গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা আব্দুল মান্নান ব্যাপারী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে একটি খেলার মাঠের প্রয়োজন অনুভব করছিলেন তারা। অবশেষে নিজেদের উদ্যোগে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়িত হওয়ায় গ্রামের সবাই আনন্দিত।
বাবুপুর মসজিদ কমিটির সভাপতি নজরুল শিকদারের মতে, মাঠে নিয়মিত খেলাধুলার সুযোগ তৈরি হলে কিশোর ও তরুণেরা সুস্থ সামাজিক পরিবেশ পাবে। একই সঙ্গে তারা মাদক ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে থাকতে উৎসাহিত হবে।
বাবুপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক ও মোনালিসা উইমেন্স স্পোর্টস একাডেমির পরিচালক মোনালিসা মুন্নি বলেন, গ্রামের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা ছিল একটি খেলার মাঠ। সবাই মিলে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে পারা নিঃসন্দেহে বড় অর্জন।
অন্যদিকে সরকারি বা বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানের সহায়তা ছাড়াই গ্রামবাসীর এমন উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন সরকারি মাওলানা মোহাম্মদ আলী কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ শামসুল হুদা। তাঁর মতে, বাবুপুরের বাসিন্দাদের এই সম্মিলিত প্রচেষ্টা দেশের অন্যান্য গ্রামের মানুষকেও নিজেদের প্রয়োজন পূরণে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে উৎসাহিত করবে।



