প্রতিবেদন প্রকাশের পর সমস্যার সমাধান না করে অফিসে ডেকে ‘অভিযোগ নেই’ লিখিত নিল কর্তৃপক্ষ!

শরীয়তপুর প্রতিনিধি: শরীয়তপুর সদর উপজেলার ধানুকা মৌজায় জমির নামজারি নিয়ে জাল দলিল ও মৃত্যু সনদ ব্যবহারের অভিযোগ তুলে প্রায় এক বছর ধরে প্রতিকার চেয়ে আসছেন অসীম কুমার দাস। এ বিষয়ে সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পরও বিতর্কিত নামজারি বাতিল কিংবা তাঁর দায়ের করা মিস মামলা নিষ্পত্তিতে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। এর মধ্যে প্রতিবেদন প্রকাশের পর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ডেকে তাঁর কাছ থেকে ‘কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ নেই’ মর্মে লিখিত বক্তব্য নেওয়ার ঘটনা সামনে এসেছে।
ভুক্তভোগী অসীম কুমার দাসের অভিযোগ, বাংলা টিভিতে প্রতিবেদন প্রচারের পর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. মাসুদুল আলমের নির্দেশে আরএম শাখার দায়িত্বে থাকা অফিস সহকারী জাহাঙ্গীর ফোন করে তাঁকে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে যেতে বলেন। সেখানে যাওয়ার পর তাঁর কাছ থেকে লিখিত বক্তব্য নেওয়া হয়। জাহাঙ্গীরও বিষয়টি স্বীকার করে জানান, কর্তৃপক্ষের নির্দেশেই তাঁকে ডাকা হয়েছিল।
গত বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) জেলা প্রশাসক তাহসিনা বেগম বরাবর দেওয়া ওই লিখিত বক্তব্যে অসীম দাস উল্লেখ করেন, কার্যালয়ের লোকজনই দরখাস্ত লিখে দিয়েছেন এবং তিনি তাতে শুধু স্বাক্ষর করেছেন। বক্তব্যে বলা হয়, ২৭ অক্টোবর বাংলা টিভিতে প্রচারিত প্রতিবেদনে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ও কর্মকর্তাদের ছবি ব্যবহার করা হলেও তিনি ওই কার্যালয়ে যাননি এবং কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ বা বক্তব্য দেননি।
পরে অসীম দাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়টি নিয়ে আর সংবাদ প্রকাশ না করার অনুরোধ জানান। তাঁর আশঙ্কা, এ বিষয়ে সংবাদ প্রকাশ অব্যাহত থাকলে জমি-সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান পাওয়া আরও কঠিন হতে পারে।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক তাহসিনা বেগম বলেন, অসীম দাস যা সত্য, তা-ই লিখিতভাবে জানিয়েছেন। তাঁকে কোনো ধরনের চাপ বা জোর করা হয়নি বলেও দাবি করেন তিনি।
তবে লিখিত বক্তব্য নেওয়ার ঘটনা সামনে এলেও অসীম দাসের মূল ভূমি-সংক্রান্ত অভিযোগের এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। সংশ্লিষ্ট সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) নারায়ণগঞ্জে বদলি হওয়ায় বর্তমানে পদটিও শূন্য রয়েছে বলে জানা গেছে।
নামজারিতে তিনটি দলিল ও মৃত্যু সনদ নিয়ে প্রশ্ন
ঘটনার সূত্রপাত ধানুকা মৌজায় ভারতপ্রবাসী বিশ্বনাথ ভট্টাচার্যের নামে এক একর ১৪ শতাংশ জমির নামজারি নিয়ে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, নামজারির ক্ষেত্রে ব্যবহৃত ২০০২ সালের ৫৬২১, ২০০১ সালের ৩৫৯১ এবং ২০১২ সালের ২৫৭১ নম্বর দলিলের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। পাশাপাশি একটি মৃত্যু সনদের তথ্য নিয়েও আপত্তি তুলেছেন অভিযোগকারীরা।
তাঁদের দাবি, অনলাইনে সংশ্লিষ্ট মৃত্যু সনদের তথ্য এবং জেলা রেজিস্ট্রারের কার্যালয়ে উল্লেখিত দলিলগুলোর রেকর্ড পাওয়া যায়নি। এসব বিষয়ে প্রতিকার চেয়ে অসীম কুমার দাস সদর ভূমি কার্যালয়ে মিস মামলা দায়ের করেন। কিন্তু দীর্ঘ সময় পার হলেও মামলাটির নিষ্পত্তি হয়নি বলে অভিযোগ তাঁর।
এডিসি রাজস্বের বিরুদ্ধে দুদকে অভিযোগ
এদিকে শরীয়তপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. মাসুদুল আলমের বিরুদ্ধে ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণের অর্থ নিয়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ করেছেন জাজিরার এক ভুক্তভোগী। এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন জাজিরার সেনের চর এলাকার মো. ফারুক শিকদার।
অভিযোগে পদ্মা সেতু সংযোগ সড়ক প্রকল্পের অধিগ্রহণ-সংক্রান্ত ২০২০-২০২১ সালের ১৫ ও ১৩ নম্বর ভূমি অধিগ্রহণ মামলার বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে।
এর আগে দুদক মাদারীপুর অঞ্চলের উপপরিচালক মহবুবুল আলম জানিয়েছিলেন, অভিযোগটি তদন্তের জন্য তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে কমিটির একজন সদস্য অনুপস্থিত থাকায় তখন তদন্ত কার্যক্রম পুরোপুরি এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি।
অধিগ্রহণ শাখায় কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ
জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ভূমি অধিগ্রহণ শাখায় ক্ষতিপূরণের অর্থ ছাড় পেতে দীর্ঘসূত্রতা এবং কথিত কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগও তুলেছেন কয়েকজন ভুক্তভোগী।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে তাঁরা জানান, অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণের বিল পেতে দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হয়। তাঁদের অভিযোগ, মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে যোগাযোগ করা হলে কোনো কোনো ফাইল দ্রুত অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় এগিয়ে যায়। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. মাসুদুল আলমের সঙ্গে পুনরায় যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি প্রতিবেদককে সময় দেননি।
উল্লেখ্য, এর আগেও এডিসি (রাজস্ব) মো. মাসুদুল আলমের প্রত্যাহারের দাবিতে ২০২৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি শরীয়তপুর-চাঁদপুর মহাসড়কের অধিগ্রহণ করা জমির ভুক্তভোগীরা মানববন্ধন করেছিলেন।
সব মিলিয়ে ভুক্তভোগীদের দাবি, তাঁদের হয়রানি না করে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট দলিল ও ভূমির নথিপত্র যাচাই করে আইন অনুযায়ী দ্রুত নামজারি-সংক্রান্ত বিরোধের নিষ্পত্তি এবং অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ নিয়ে ওঠা অভিযোগগুলোর সুরাহা নিশ্চিত করতে হবে।



