দেশবাংলা

ডিভোর্স দেয়ায় জামাতার বসতবাড়ি ও দোকান ঘর দখল

||বেলাল হোসেন মিলন, বরগুনা||

ডিভোর্স দেয়ায় জামাতার বসতবাড়ি ও দোকান ঘর দখলের অভিযোগ উঠেছেন বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার নাচনাপাড়া ইউনিয়নের মানিকখালী গ্রামের এক প্রভাবশালী সাবেক ইউপি সদস্য তার মেয়ে এবং তাদের স্বজদের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী একই গ্রামের রেনু বেগম বাদী হয়ে পাথরঘাটার সিনিয়র জুডিসিয়্যাল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা দায়ের করলে আদালত অভিযুক্ত সাবেক ইউপি সদস্য মহিউদ্দিন পান্না তার মেয়ে লায়লা আক্তার পপিসহ পাঁচ জনের বিরুদ্ধে সমন জারি করে।

অন্যদিকে সাবেক এই ইউপি সদস্য ও তার স্বজনদের অনবরত হুমকির কারণে নিজ এলাকাও আসতে পারছেন না ভুক্তভোগীরা। এদিকে সরেজমিনে এ ঘটনার সংবাদ সংগ্রহ করতে গেলে ভুক্তভোগী রেনু বেগমের পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি তাদের পক্ষে অবস্থান নেয়া স্থানীয় অধিবাসী এবং যারা এই প্রতিবেদককে এ ঘটনার তথ্য জানিয়েছেন, তাদেরকে মারধর ও মামলায় আসামী করার হুমকি দেন সাবেক ইউপি সদস্য মহিউদ্দিন পান্না।

মামলা সূত্রে জানা যায়, মানিকখালী গ্রামের আবদুল খালেক-রেনু বেগম দম্পত্তির সৌদি আরব প্রবাসী ছেলে আব্দুল্লা আল নোমানের সাথে একই গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য মহিউদ্দিন পান্নার মেয়ে লায়লা আক্তার পপির সাথে দু’বছর আগে বিবাহ হয়। বিয়ের দু’বছরের মধ্যে নোমান-পপি দম্পত্তির দু’টি পুত্র সন্তান জন্ম নেয়।

ডিভোর্স দেয়ায় জামাতার বসতবাড়ি ও দোকান ঘর দখলকিন্তু বিয়ের পর পপির বাড়ির খুব নিকটে তার শশুর বাড়ি হওয়া সত্যেও তিনি মাসের পর মাস তার বাবার বাড়িতে অবস্থান করেন। দফায় দফায় পপির শাশুড়ী রেনু বেগমসহ তার স্বজনরা পপি ও তার স্বজদেন নানা ভাবে বুঝিয়েও পপিকে তার শশুর বাড়িতে ফিরিয়ে নিতে ব্যর্থ হয়। এরপর গত ২৫ সেপ্টেম্বর পপিকে তার শশুর বাড়ি ফিরিয়ে দেয়াসহ পপির স্বমী আব্দুল্লা আল নোমানের কাছ থেকে পপির বাবা ও মায়ের নির্বাচন খরচ বাবদ বিভিন্ন সময়ে নেয়া ১১ লাখ টাকা ফিরিয়ে দেয়ার দাবিতে পপির বাবা মহিউদ্দিন পান্নকে আইনি নোটিস পাঠান নোমানের মা রেনু বেগম।

মামলা সূত্রে আরো জান যায়, আইনি নোটিস পাঠানোর সাত দিন পরও পপি তার স্বামীর বাড়িতে না গেলে গত দুই অক্টোবর পপির স্বামী নোমান তাকে নোটারীর মাধ্যমে ডিভোর্স দেন। এরপর গত ২৬ অক্টোবর নোমানের পক্ষাঘাতগ্রস্ত বাবা আবদুল খালেককে চিকিৎসার জন্য মানিকখালীর গ্রামের বাড়ি তালাবদ্ধ করে ঢাকায় যান নোমানের মা রেনু বেগম। ঢাকায় যাওয়ার একদিন পর গত ২৭ অক্টোবর দুপুরের দিকে তাদের বসতবাড়ির তালা ভেঙ্গে বাড়ি দখল করে নেয় অভিযুক্ত সাবেক ইউপি সদস্য মহিউদ্দিন পান্না তার মেয়ে লায়লা আক্তার পপিসহ তার স্বজনরা। এসময় ঘরের বালিশের মধ্যে লুকানো সাড়ে তিন লাখটাকাসহ মূল্যবান কাগজপত্রও নিয়ে যায় তারা। একই সঙ্গে পাথরঘাটার নাচনাপাড়া ওমানিকখালি বাজারের তিনটি দোকান ঘরের দখলও নেয় তারা।

এ বিষয়ে নোমানের মা রেনু বেগম বলেন, আমার একমাত্র ছেলের বধূ ছিলো পপি। আমার দুই নাতীকে নিয়ে পপি মাসের পর মাস ধরে তার বাবার বাড়িতে থাকতো। আমাদের সকল চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর আইনি নোটিস পাঠিয়েও তাকে আমরা বাড়িতে আনতে পারিনি। এরপর আমার ছেলে বাধ্য হয়েই পপিকে ডিভোর্স দেয়। ডিভোর্স দেয়ার একমাস পর পপি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা দায়ের করে আমার ছেলে নোমানকে জেলে পাঠিয়েছে।

তিনি আরো বলেন, আমার স্বামীর তিনবার ব্রেন স্ট্রোক ও একবার হার্ট স্ট্রোক হয়েছে। তার চিকিৎসার জন্য ঘর তালাবদ্ধ করে স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে আমি ২৬ অক্টোবর ঢাকা যাই। আমাদের ঢাকা যাওয়ার কারণে তালাবদ্ধ ফাঁকা বাসা পেয়ে ডিভোর্স দেয়ার ২৫ দিন পর গত ২৭ অক্টোবর দুপুরে দিকে অনেক লোকজন নিয়ে ঘরের তালা ভেঙ্গে পান্না তার মেয়েকে আমাদের ঘরে উঠিয়ে দেয়। ঘরে প্রবেশ করে ঘরে থাকা সাড়ে তিনলাখ টাকা ও গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র নিয়ে যায় তারা। সেই থেকে পান্না ও তার মেয়ে আমার ঘরে বসবাস করছে এবং নাচনাপাড়া ও বাঁশতলা বাজারে থাকা তিনটি দোকান ঘরের ভাড়ার টাকাও পান্ন নিয়ে নিচ্ছে।

এছাড়াও আমিসহ আমার অসুস্থ স্বামী আমার একমাত্র মেয়ে ও মেয়ে জামাইকে মারধরের হুমকি দিয়ে যাচ্ছে পান্না। তাই পান্নার ভয়ে আমরা কেউ বাড়ি না যেতে পেরে ঢাকায় অবস্থান করছি। এজন্য পান্নার মেয়ের দায়ের করা মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার হওয়া আমার একমাত্র ছেলেকেও জেল থেকে মুক্ত করতে পারছি না।

রেনু বেগমের নিকট প্রতিবেশি জাহানার বেগম বলেন, রেনু ও তার স্বামী ঢাকায় যাওয়ার পরের দিন দুপুরের দিকে রেনুর খালি বাসায় পান্না তার কয়েকজন সহযোগীকে নিয়ে তার মেয়ে পপিকে ঘরে উঠিয়ে দিয়ে যায়। এরপর থেকে এই ঘরে পপি তার দুই ছেলে ও স্বজনদের নিয়ে বসবাস করছে।

এ বিষয়ে স্থানীয় সাবেক ইউপি সদস্য মোঃ হারুন বলেন, তালা ভেঙ্গে লোকজন নিয়ে পপি ও তার স্বজনদের ঘরে ওঠার খবর রেনু বেগম ফোনে আমাকে জানালে আমি রেনুর বাড়ি যাই। এসময় রেনু ও তার স্বামী ঢাকায় থাকলেও ঘরের মধ্যে আমি পান্না, তার মেয়ে পপি ও তাদরে অন্য স্বজনদের দেখতে পাই। পরে রেনুর তথ্য অনুযাই আমি বালিশের মধ্যে সাড়ে তিন লাখ টাকা খুজতে গেলে, সেই বালিশটি ঘরের মেঝেতে ছিড়া অবস্থায় পাই। তবে বালিশের মধ্যে আমি কোন টাকা পাইনি। আর ঘরে একটি স্যুটকেসের অল্পকিছু কাগজ পাই, যেগুলো আমি তার বোনের কাছে পৌছে দেই।

রেনু বেগমের সাবেক পুত্রবধূ পপির সাথে কথা বলতে চাইলে তাকে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে দেয়নি তার বাবা মহিউদ্দিন পান্না। তবে ডিভোর্স হওয়ার পর তালা ভেঙ্গে রেনু বেগমের ঘরে ঢোকার কথা অস্বীকার করে পান্না বলেন, রেনুর ছেলে নোমান আমার মেয়েকে এককভাবে ডিভোর্স দিয়েছে। এই ডিভোর্স আমরা মানি না। তাই পপির কাছে থাকা চাবি দিয়ে এই ঘরের তালা খুলে আমরা ঘরে প্রবেশ করেছি। আর দোকান ঘর দখলের বিষয়ে তিনি বলেন, দোকঘর থেকে যে ভাড়া আসে তা নোমান-পপির দুই ছেলের পেছেনে ব্যয় করি।

এ বিষয়ে বরগুনার পাথরঘাটা সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বিএম আশরাফ উল্লাহ বলেন, বাড়ি দখলের খরব পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শণ করে পপি তার দুই ছেলে ও তার অন্য স্বজনদের ঘরে দেখেতে পেয়েছে। তবে পপিতে যে ডিভোর্স দেয়া হয়েছে এ বিষয়ে পুলিশ তখন অবগত ছিলো না।

তিনি বলেন, যেহেতু ঘটনাটি মামলায় গড়িয়েছে, তাই আদালতের মাধ্যমেই এঘটনার সমাধান হবে। রেনু বেগমের পরিবারের সদস্যদের হুমকি দেয়ার বিষয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরী করার পরামর্শ দেন তিনি।

বাংলাটিভি/এবি

সংশ্লিষ্ট খবর

Back to top button
Close