বাংলাদেশঅপরাধ

গাইবান্ধায় ছয় মাসে ধর্ষণের শিকার ১২৫ নারী-শিশু

গাইবান্ধা প্রতিনিধি: গাইবান্ধায় উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে ধর্ষণ ও নারী-শিশুর প্রতি যৌন সহিংসতার ঘটনা। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ নিয়ে গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালে এসেছেন ১২৫ জন নারী ও শিশু। একই সময়ে নারী নির্যাতনের আরও ১২৪টি ঘটনার তথ্যও নথিভুক্ত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে দ্রুত বিচার, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে ১২৫ জন নারী ও শিশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ২১ জন ভুক্তভোগী চিকিৎসা, স্বাস্থ্য পরীক্ষা বা মেডিকেল রিপোর্টের জন্য হাসপাতালে এসেছেন। আক্রান্তদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশই শিশু, স্কুল ও কলেজপড়ুয়া কিশোরী।

ভুক্তভোগীদের স্বজনরা জানান, এমন নৃশংস ঘটনার পুনরাবৃত্তি যেন আর কোনো পরিবারকে সহ্য করতে না হয়। তারা ঘটনার দ্রুত তদন্ত, দৃষ্টান্তমূলক বিচার এবং অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানান।

নারী অধিকারকর্মীদের মতে, বিচারহীনতার সংস্কৃতি, নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, অনলাইনে ক্ষতিকর কনটেন্টে সহজ প্রবেশ, সামাজিক অবক্ষয় এবং আইনি প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা যৌন সহিংসতা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। তাদের ভাষ্য, শুধু অপরাধী গ্রেপ্তার করলেই হবে না; দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সমাজ ও রাষ্ট্রকে সমন্বিতভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।

সিনিয়র সাংবাদিক সিদ্দিক আলম দয়াল বলেন, যৌন সহিংসতা প্রতিরোধে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক মূল্যবোধ ও পারিবারিক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, গাইবান্ধা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক রিকতু প্রসাদ বলেন, নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার পাশাপাশি ভুক্তভোগীদের প্রতি সংবেদনশীল আচরণ নিশ্চিত করা জরুরি।

বাংলাদেশ নারী মুক্তি কেন্দ্রের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট নিলুফার ইয়াসমিন শিল্পী বলেন, অপরাধীদের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা না গেলে এ ধরনের অপরাধ কমানো কঠিন হবে।

গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. আসিফ উর রহমান বলেন, ‘জেলার সাত উপজেলা থেকে ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মোট ১২৫ জন নারী ও শিশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়েছে। পুলিশ ভুক্তভোগীদের হাসপাতালে নিয়ে এলে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে মেডিকেল রিপোর্ট তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে পাঠানো হয়।’

তিনি আরও জানান, হাসপাতালের ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেলের মাধ্যমে ভুক্তভোগীদের আইনি ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। তবে জনবল সংকটের কারণে সীমিত সক্ষমতায় সেবা কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে।

অন্যদিকে জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ধর্ষণ ও গণধর্ষণের ঘটনায় মোট ৫৬টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ৫৩টি ধর্ষণ এবং তিনটি গণধর্ষণের মামলা। এসব ঘটনায় অনেক আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং পলাতকদের ধরতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

গাইবান্ধা জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) শরীফ আল রাজীব বলেন, ‘শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষে এ ধরনের অপরাধ নির্মূল করা সম্ভব নয়। পরিবার, শিক্ষক, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং সচেতন নাগরিকদের সম্মিলিত উদ্যোগে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।’

বিশেষজ্ঞদের মতে, ধর্ষণ ও নারী-শিশুর প্রতি সহিংসতা শুধু একটি ফৌজদারি অপরাধ নয়; এটি মানবাধিকার ও সামাজিক নিরাপত্তার ওপর গুরুতর আঘাত। দ্রুত বিচার, কঠোর আইন প্রয়োগ, ভুক্তভোগীবান্ধব সহায়তা ব্যবস্থা এবং পরিবার-সমাজের সমন্বিত সচেতনতাই এ ধরনের অপরাধ কমিয়ে আনতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। নিরাপদ সমাজ গড়তে রাষ্ট্রের পাশাপাশি প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্বশীল অংশগ্রহণ এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

সংশ্লিষ্ট খবর

Back to top button